পূর্ণ হলো টেকনাফে সিনহা হত্যা মামলার দুই বছর। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত ৯টায় শামলাপুর চেকপোস্টে তাকে গুলি করে হত্যা করে শামলাপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাবেক পুলিশ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী গং।
২০২০ সালের জুলাইয়ের রাতে সাবেক সেনা কর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানেক হত্যার পর দেশজুড়ে নানা সমালোচনার জন্ম নেয়। এই ঘটনায় ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে মৃত্যুদণ্ড ও সাতজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকী সাতজনকে খালাস দেন আদালত।
হত্যার দুই বছরে এসে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকর চেয়েছেন সিনহার মা ও বোন।
সিনহার মা নাসিমা আক্তার বলেন, সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ছিল পরিবারের জন্য প্রাণের উৎস। সে যখনি সুযোগ পেয়েছে শুধুমাত্র মানুষের কল্যাণে এগিয়ে গিয়েছে। যেসব নরপিশাচরা সিনহাকে হত্যা করে মায়ের বুক খালি করেছে তাদেরকে কোনদিন ক্ষমা করবেন না।
সিনহার মায়ের একমাত্র প্রত্যাশা, তার মৃত্যুর আগে যেন সন্তানের হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর হয়।
মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস জানান, উচ্চ আদালতে মামলাটি আপিলে রয়েছে। এ পর্যন্ত মামলা যতটুকু এগিয়েছে তাতে সন্তুষ্ট তারা। এখন উচ্চ আদালতের দ্রুত শুনানি করে বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। আর যারা খালাস পেয়েছেন, এ ব্যাপারে আপিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি। তিনি দ্রুত শুনানি করে ভাইয়ের হত্যার ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেছেন উচ্চ আদালতের কাছে।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, এ মামলার রায় হওয়ার পর নিম্ন আদালতের সব ধরনের কাগজপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পক্ষে হাইকোর্টে দুটি আপিলও করা হয়েছে।
তিনি জানান, মামলায় যারা খালাস পেয়েছেন, এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কথা ছিল। তবে তা হয়েছে কিনা তা তার জানা নেই।
তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের আপিলের শুনানি করতে সময় লাগে। এখন আদালত কখন শুনানি করে তা দেখার অপেক্ষায়। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি দ্রুত শুনানি করা জরুরি।
তিনি আশা করছেন, নিম্ন আদালতের রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে। একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার জাতি দেখবে।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ফরিদুল আলম জানান, খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ৩১ জুলাই শেষ হচ্ছে। এই আপিলের বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নন তিনি। তবে উচ্চ আদালতের কাছে আবেদন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের শুনানি দ্রুত করে এর বিচার নিশ্চিত করা।
তিনি প্রত্যাশা করেছেন, উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখবেন।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। পরদিন ১ আগস্ট এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি এবং রামু থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সরকারি কাজে বাধা এবং মাদক আইনে এই মামলা দুটি দায়ের করা হয়।
টেকনাফ থানায় দায়ের করা এ দুই মামলায় নিহত সিনহার সঙ্গী সাইদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। এছাড়া রামু থানায় মাদক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে আসামি করা হয় নিহত সিনহার অপর সঙ্গী শিপ্রা দেবনাথকে।
২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কক্সবাজার আদালতে মামলা দায়ের করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে।
মামলার অন্য আসামিরা হলো, টেকনাফ থানার তৎকালীন বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, উপ-পরিদর্শক (এসআই) টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা।
মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত করার পর আদালত তদন্তভার দেন র্যাবকে। একই সঙ্গে পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটিও র্যাবকে তদন্ত করার আদেশ দেন আদালত।
২০২০ সালের ৬ আগস্ট সকালে মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত করে তদন্তের জন্য র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেদিন বিকালে মামলায় অভিযুক্ত ৯ জনের মধ্যে সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
ওই দিন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা নামের কোনও পুলিশ সদস্য জেলা পুলিশে কর্মরত ছিল না। সেদিনই আত্মসমর্পণকারী আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
র্যাব মামলার তদন্তকালে ২০২০ সালের ১১ আগস্ট গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশের দায়ের করা মামলার তিন সাক্ষী টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকার মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আয়াজ ও নিজাম উদ্দিনকে। ওই দিন তাদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
মামলা তদন্তের এক পর্যায়ে ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট এপিবিএন-এর তিন সদস্য সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শাহজাহান মিয়া, কনস্টেবল মো. রাজীব ও কনস্টেবল মো. আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে র্যাব আদালতে সোপর্দ করে। ওই দিনই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হয়।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর র্যাব কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ওই দিনই রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। কারাগারে থাকা এই ১৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এদের মধ্যে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্য ১২ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর র্যাব-১৩ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খাইরুল ইসলাম ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে থাকলেও টেকনাফ থানার কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক ছিলেন। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে। একই দিন পুলিশের দায়ের করা মামলা ৩টির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ গ্রেপ্তারি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। সেইসঙ্গে পুলিশের দায়ের করা তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সাইদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা দেবনাথকে অব্যাহতি দেন আদালত।
এরপর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর আদালত থেকে মামলাটির কার্যক্রম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের আদালতে বদলি করা হয়।
২০২১ সালের ২৪ জুন পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এতে আদালত ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
২০২১ সালের ২৭ জুন আদালত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরুর আদেশ দেন। সেইসঙ্গে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দিন ধার্য করেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ধার্য দিনগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
পরে ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আট দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য দেন। এরপর ৬ ও ৭ ডিসেম্বর আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। সবশেষে ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ২০২১ সালে বিকালে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার মোট ১৫ আসামির দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড, ছয়জনকে যাবজ্জীবন ও সাতজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন, টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বরখাস্ত হওয়া পরিদর্শক লিয়াকত আলী। তাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখতে বলেছেন বিচারক।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাগর দেব, রুবেল শর্মা, পুলিশের সোর্স নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও আয়াজ উদ্দীন।
আরও পড়ুন: ফতুল্লায় যুবককে কুপিয়ে হত্যা
মামলা থেকে খালাস পাওয়া সাত জন হলেন, এপিবিএনের এসআই শাহজাহান আলী, কনস্টেবল মো. রাজীব, মো. আব্দুল্লাহ, পুলিশের কনস্টেবল সাফানুল করিম, কামাল হোসেন, লিটন মিয়া ও আব্দুল্লাহ আল মামুন।
এছাড়া মেজর সিনহা নিহত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। গঠিত কমিটি তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কী ধরনের বিষয়বস্তু উল্লেখ ছিল তা প্রকাশ পায়নি। একই ইস্যুতে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারসহ একযোগে দেড় সহস্রাধিক পুলিশ সদস্যকে অন্যত্রে বদলি করে তদস্থলে নতুন পুলিশ সদস্যদের পদায়ন করা হয়েছিল।
