প্রথম পর্ব

হিগস বোসন, হিগস ফিল্ড ও আমাদের মহাবিশ্ব

বিগ ব্যাঙের 10-10 সেকেন্ড পর একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে। আমাদের মহাবিশ্বের স্থান-কাল তার অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলে। বিজ্ঞানীরা এই ধরনের পরিবর্তনকে বলেন ফেজ ট্রানজিশন(Phase transition) বা দশা পরিবর্তন। আমরা সবাই পানির দশা পরিবর্তনের সাথে পরিচিত। তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে সাথে পানি কঠিন থেকে তরল, তরল থেকে জলীয় বাস্পে পরিণত হয়। পানির ক্ষেত্রে তাপমাত্রা পরিবর্তনের হলে পানির অণুগুলোর ভিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে তাদের বাহ্যিক দশার পরিবর্তন করে। কিন্তু আমরা যে ফেজ ট্রানজিশনের কথা বলছি এটি কোন বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, বরং এই মহাবিশ্বের স্থান-কালের একদম মৌলিক একটি পরিবর্তন। 

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৯:৫৭ এএম

এই পরিবর্তনের ফলে সমস্ত স্থান-কাল সম্পুর্ন নতুন একটি জিনিসে পরিপূর্ণ হয়ে যায় । এটিকে আমরা এখন হিগস ফিল্ড বলি। এই জিনিসটি আমাদের কাছে সম্পুর্ন অদৃশ্য। এমনকি উপলব্ধি করার মতও নয়। তবে আমরা এই হিগস ফিল্ডের উপস্থিতি বুঝতে না পারলেও ইলেক্ট্রনের মত মৌলিক কণিকারা এর প্রভাব ঠিকই বুঝতে পারে। অর্থাৎ অতিক্ষুদ্র মৌলিক কনিকাদের কাছে এই হিগস ফিল্ড একটি বাস্তব জিনিস।      

আমরা যেমন একটি বায়ু-সমুদ্রের মধ্যে ডুবে আছি, ঠিক তেমনি এই হিগস ফিল্ডও সবসময় আমাদের ঘিরে রেখেছে । এখন আমরা যদি পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে চলে যাই, তবে এই বাতাস আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু মহাবিশ্বের এমন কোন স্থান নেই যেখানে এই হিগস ফিল্ডের উপস্থিতি নেই। অর্থাৎ এটি আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত শুন্যস্থান জুড়েও অবস্থান করছে। ইলেকট্রনের মত কিছু মৌলিক কণিকা এই হিগস ফিল্ডের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়িয়ে পরে। আর এর ফলে এসব কনিকারা কিছুটা শক্তি লাভ করে। কোন একটি কণিকা তার জন্মের সাথে সাথেই এই ফিল্ডের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে থাকে। 

হিগস বোসন, হিগস ফিল্ড ও আমাদের মহাবিশ্ব
এমনকি যদি সে স্থির অবস্থায় থাকে, তবুও এই মিথস্ক্রিয়া চলতেই থাকে। ফলে কোন কণিকা তৈরি হবার সাথে সাথেই এই মিথঃস্ক্রিয়া থেকে কিছুটা শক্তি লাভ করে। আর এই সহজাত(intrinsic) শক্তিকেই আমরা বলি ভর। আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত ভর-শক্তি সমীকরণ- E=mc2 থেকে আমরা জানি যে- ভর আর শক্তি মূলত একই জিনিস। কণিকারা হিগস ফিল্ডের সাথে মিথঃস্ক্রিয়ার ফলে শক্তি পায়, আর আমাদের কাছে মনে হয় যেন এসব কণিকাদের কিছুটা ভর রয়েছে। হিগস ফিল্ডের সাথে মিথস্ক্রিয়ার করে মৌলিক কনিকাদের ভর পাবার এই পক্রিয়াকে বলা হয় হিগস মেকানিজম(Higgs mechanism)।  

সব কণিকাই কিন্তু হিগস ফিল্ডের সাথে এই কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়ায় না। যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সাথে এই মিথঃস্ক্রিয়ায়(interaction) অংশ নেয় তাদের ভর থাকে, আর যারা কোন প্রকার মিথঃস্ক্রিয়ায় জড়ায় না তারা ভরহীণ থেকে যায়। কিছু কিছু কণিকা হিগস ফিল্ডের সাথে খুব শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে এদের ভরও হয় অনেক বেশি। যেমন- টপ কয়ার্ক। একটি টপ কোয়ার্কের ভর এতই বেশি যে, তা পুরো একটি টাংস্টেন পরমাণুর সমান । 
আর যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সাথে খুব সামান্য মিথস্ক্রিয়া করে, তাদের ভর হয় খুবই কম, যেমন ইলেকট্রন। ইলেকট্রনের ভর এতই কম যে, কোন পরমাণুর মোট ভর হিসেবের সময় এই ভর হিসেবে না ধরলেও চলে। আবার ফোটন হিগস ফিল্ডের সাথে কোন মিথস্ক্রিয়াই করে না। ফলে ফোটন ভরহীন থেকে যায়।  

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুসারে- কোন কোয়ান্টাম ফিল্ডকে যদি আমরা প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করি তবে সেই ফিল্ডে এক ধরনের কম্পন তৈরি হবে। এই কম্পনের ফলে সেই ফিল্ডের কোয়ান্টা তৈরি হয়। আর সেই কোয়ান্টাগুলোকেই আমরা কণিকা হিসেবে পর্যবেক্ষন করি। অর্থাৎ আমরা যেসব মৌলিক কণিকার কথা বলি- এগুলো মূলত বিভিন্ন কোয়ান্টাম ফিল্ডের কম্পন। ইলেকট্রনের ফিল্ডকে যদি আঘাত করা হয় তবে ইলেকট্রন তৈরি হবে; কোয়ার্ক ফিল্ডে আঘাত করলে কোয়ার্ক তৈরি হবে । ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডে আঘাত করলে আলোর কণিকা ফোটন তৈরি হবে। হিগস ফিল্ড যেহেতু একটি কোয়ান্টাম ফিল্ড, তাই হিগস ফিল্ডকে আঘাত করলেও একটি কণিকা তৈরি হবে। হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টাকে আমরা বলি হিগস বোসন। 

হিগস বোসন, হিগস ফিল্ড ও আমাদের মহাবিশ্ব

এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরাকার- হিগস বোসন কিন্তু মৌলিক কণিকাদের ভর প্রদান করে না, বরং এই কাজটি করে হিগস ফিল্ড। হিগস বোসনের নিজেরও ভর রয়েছে। আর সেটাও আসে এই হিগস ফিল্ড থেকে। লক্ষ্য করলে দেখবেন- উপরে উল্লেখ করা সব জায়গায়ই বলা হয়েছে- হিগস ফিল্ড, “মৌলিক” কণিকাদের ভর প্রদান করে। কোথাও বলা হয়নি, “পদার্থের সকল ভর হিগস ফিল্ড থেকে আসে”। সাধারণ পদার্থ গঠিত হয় ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন দিয়ে। ইলেকট্রন একটি মৌলিক কণিকা, তাই একটি ইলেকট্রনের সকল ভরই হিগস ফিল্ড থেকে আসে। কিন্তু প্রোটন কিন্তু মৌলিক কণিকা নয়। দুইটি আপ কোয়ার্ক আর একটি ডাউন কোয়ার্ক মিলে একটি প্রোটন তৈরি করে। আপ কোয়ার্কের ভর ২.৩ MeV আর ডাউন কোয়ার্কের ভর ৪.৮ MeV। 

হিসেব অনুয়ায়ী একটি প্রোটনের ভর হবার কথা- (২.৩+২.৩+৪.৮) = ৯.৪ MeV। কিন্তু একটি প্রোটনের ভর আসলে ৯৩৮.২৮ MeV। তাহলে প্রোটনের বাকি ভর আসে কোথা থেকে? প্রোটনের বাকি ভর আসে সবল নিউক্লীয় বলক্ষেত্রে থেকে। তড়িৎ চুম্বক বলক্ষেত্র যেমন পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন ও প্রোটনকে ধরে রাখে, তেমনি সবল নিউক্লীয় বল দুইটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ককে একত্রে বেধে রেখে প্রোটন তৈরি করে। 

এই বেধে রাখার কাজটি করে সবল নিউক্লীয় বলের কণিকা গ্লুওন। প্রোটনের বাকি ভরটুকু আসে এই ভরহীন গ্লুওনের গতিশক্তি থেকে। দেখা যাচ্ছে একটি প্রোটনের মোট ভরের ১ শতাংশেরও কম ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে। (চলবে) 

লেখক পরিচিতি: হিমাংশু কর বিজ্ঞান লেখক হিসেবে পরিচিত। তার পাঠকপ্রিয় বইয়ের ভেতরে রয়েছে স্ট্রিং থিওরি, টাইম ট্রাভেল সহ দশটির বেশি বই।  

এআর
মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য বা উপদেষ্টার কার্যক্রমে সন্তুষ্ট না হলে প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় তার দায়িত্ব পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন কাউকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও...
জর্ডানে ইরানের সামরিক অভিযানে দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর এবার মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো এবং তৎকালীন সময়ে সংঘটিত...
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চুরি ও পকেটমারির অভিযোগে একটি চক্রের ছয় নারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন স্থানীয় জনতা ও আনসার সদস্যরা। 
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর