বিশ্বকাপ শুরু হতে যখন আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, ঠিক তখনই ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। গত রোববার ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইন্টার মায়ামির এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল ম্যাচে খেলার ৭৩তম মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। আলবিসেলেস্তে শিবিরের আকাশজুড়ে যখন ইনজুরির কালো মেঘ, ঠিক তখনই ইন্টার মায়ামির হেড কোচ গুইলার্মো হোয়োস ভক্তদের শান্ত করার চেষ্টা করে দাবি করেছেন, এটি কোনো গুরুতর ইনজুরি নয়, কেবলই ‘ক্লান্তি’!
ম্যাচের প্রথমার্ধে দুটি চোখধাঁধানো অ্যাসিস্ট করে দলকে চাঙ্গা রাখলেও, দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে পায়ের নিচের অংশে অস্বস্তি অনুভব করেন মেসি। ৭১তম মিনিটে খেলা চলার সময় সাইডলাইনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বেঞ্চের দিকে ইশারা করেন তিনি। এরপর বল মাঠের বাইরে গেলে ৭৩তম মিনিটে মেসির বদলি হিসেবে মাঠে নামেন মাতেও সিলভেত্তি। মাঠ ছাড়ার আগে মেসিকে নিজের বাম পায়ের হ্যামস্ট্রিং চেপে ধরে রাখতে দেখা যায়, যা দেখে গ্যালারিতে থাকা ভক্তদের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মেসির চোটের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কোচ হোয়োস বেশ সতর্ক কিন্তু ইতিবাচক সুরেই বলেন, আমার জানা মতে, এখনো কোনো মেডিকেল রিপোর্ট আমাদের হাতে আসেনি। খুব দ্রুতই তা পাওয়া যাবে, তবে মেসি মূলত চরম ক্লান্ত ছিল। সাংবাদিকরা যখন মেসির মাঠ ছাড়ার মুহূর্তটি নিয়ে আরও খোঁচাখুঁচি শুরু করেন, কোচ তখন তাঁর আগের দাবিতেই অনড় থাকেন, ক্লান্তি, কেবলই ক্লান্তি... ও ক্লান্ত ছিল, মাঠটাও ভারী ছিল। আর যখনই কোনো সন্দেহ তৈরি হয়, তখন নিয়মই হলো কোনো ধরনের ঝুঁকি না নেওয়া।
মেসি যখন মাথা নিচু করে ইন্টার মায়ামির একজন স্টাফের সাথে সরাসরি টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন টিভির পর্দায় সেই দৃশ্য দেখে আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। তবে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পরপরই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত স্পোর্টস জার্নালিস্ট এবং জাতীয় দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইনসাইডার গ্যাস্টন এদুল এক টুইটে পুরো আর্জেন্টিনাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেন।

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সময় দলের সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকা এদুল নিশ্চিত করেছেন, মেসির বাম হ্যামস্ট্রিংয়ে পেশির কোনো টিয়ার বা গুরুতর ফাটল ধরেনি। হ্যামস্ট্রিংয়ে কিছুটা টান ও অতিরিক্ত চাপ অনুভব করায় কেবল সতর্কমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মেসি নিজেই মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, যাতে আসন্ন বিশ্বকাপের স্বপ্ন কোনোভাবে হুমকির মুখে না পড়ে।
ফিলাডেলফিয়ার বিরুদ্ধে এই ম্যাচটিই ছিল ইন্টার মায়ামির হয়ে বিশ্বকাপের আগে মেসির শেষ ম্যাচ। এখন তাঁর পুরো মনোযোগ আন্তর্জাতিক ডিউটিতে। ৩০ মে’র ডেডলাইনের আগেই কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁর চূড়ান্ত ২৬ জনের দল ঘোষণা করবেন এবং আগামী ১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার মূল বিশ্বকাপ ক্যাম্প শুরু হবে।

অন্যদিকে, ইউরোপে খেলা ফুটবলাররা মে মাসের শেষ সপ্তাহেই আর্জেন্টিনার এযেইজা কমপ্লেক্সে এসে প্রাথমিক অনুশীলন শুরু করবেন, সেখান থেকে পরে তারা উত্তর আমেরিকায় দলের সাথে যোগ দেবেন।
বিশ্বকাপের মূল লড়াইয়ে নামার আগে আর্জেন্টিনা দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে। আগামী ৬ জুন হন্ডুরাসের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে আলবিসেলেস্তেদের গা-গরমের পালা, যার অর্থ মেসি বিশ্রামের জন্য প্রায় দুই সপ্তাহ সময় পাচ্ছেন। এরপর ৯ জুন আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে চ্যাম্পিয়নরা চলে যাবে তাদের বিশ্বকাপ ঘাঁটিতে।
আর আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ ম্যাচ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের বিশ্বখেতাব ধরে রাখার মিশন শুরু করবে আর্জেন্টিনা। ভক্তদের এখন একটাই প্রার্থনা, মেসির এই ‘ক্লান্তি’ যেন কেবলই সাময়িক হয়, আর ১০ নম্বর রাজপুত্র যেন পূর্ণ ফর্মে মাঠে নামেন।
