জীবনযাত্রার খরচ সহনীয় পর্যায়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঘোষণা হচ্ছে চলতি অর্থবছরের বাকি ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি। এবারও নীতি সুদের হার আরেক দফা বাড়িয়ে টাকাকে আরও দামি করার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির চলমান সঙ্কট মেটাতে মুদ্রানীতি নয় বরং বাজার ব্যবস্থার তদারকির পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনে জয়লাভের পর দ্রুততম সময়ে শপথ শেষে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। অর্থ-বাণিজ্য ও পরিকল্পনায় নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যখন দায়িত্ব নিলো তখন অর্থনৈতিকভাবে বেশ সংকটে দেশ। মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া মুদ্রানীতির খুব একটা প্রভাব দেখা যায়নি অর্থনীতিতে। সেই সঙ্গে আছে মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জও।
দেশের মানুষকে প্রতিটি পণ্য ও সেবার জন্য গুণতে হচ্ছে বাড়তি প্রায় দশ টাকা আগের বছরের তুলনায়, দফায় দফায় দাম পরিবর্তন করেও বাগে আনা যাচ্ছে না ডলার। কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পণ্যের আমদানি কমলেও, খরচ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। সে তুলনায় প্রবাসী আয় ও রফতানিতে নেই কাংখিত আয়। আর এতেই কমছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ। নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ বিনিয়োগকারীদের না থাকলেও বাড়ছে সুদের হার, যাকে ব্যবসা ও বিনিয়োগে অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলছেন বিনিয়োগকারীরা।
দেশের ব্যাংক খাতেও অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম কোনভাবেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি। রেকর্ড খেলাপি ঋণ নিয়ে চলছে দেশের ব্যাংক খাত। গত কয়েক বছরে এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট।
দেশে প্রায় গত দুই বছর ধরে চলছে ডলার সংকট। ২০২৩ সালে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এর ফলে প্রতি ডলারের দাম ব্যাংকে ১১০ টাকায় ঠেকেছে। তবে খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২২ থেকে ১২৫ টাকায়। ডলার সংকটের প্রভাবে অনেক ব্যাংক ঠিকমতো এলসি খুলতে পারেনি। ডলার চাহিদা দিন দিন আরও বাড়ছে।
দেশের ব্যাংক খাত এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। প্রতি কার্যদিবসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করছে তারল্য সংকটে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অপরদিকে অনেক ব্যাংক এখন সরকারি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করছে। সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদের হার ১১ দশমিক ১৫ শতাংশে উঠেছে।
দেশের অন্যতম বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি। সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা নয় মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে ছিলো। ২০২৩ সালে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি দুটোই রেকর্ড গড়ে। গত আগস্টে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে উঠেছিলো ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে।
এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একই বছরের মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে উঠেছিলো। এর আগে ২০১২ সালের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ১০ শতাংশে উঠেছিল।
এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এ সপ্তাহে মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে অস্থিরতা কমাতে নতুন মুদ্রানীতিও হবে সংকোচনমূলক তবে বহাল থাকছে উচ্চ সুদহার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, এবারের মুদ্রানীতিতে সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব কিছু এখনই বলা যাচ্ছে না। মুদ্রনীতি ঘোষণার সময়ই বিস্তারিত জানানো হবে। এরই মধ্যে মুদ্রানীতির মৌলিক কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার ও আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে ব্যর্থ হবে সব উদ্যোগ। আর এ জন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আগে থেকে মুদ্রানীতির খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করা হলেও নতুন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
নতুন বছরের শুরুতে বাড়ছে রেমিট্যান্স