দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি মণ ধানের দাম বেড়েছে গড়ে ২০০ টাকা। একই সময়ে বস্তা প্রতি চালের দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। সেই হিসেবে পাইকারি-খুচরা মিলিয়ে কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা।
হঠাৎ করে কেন বাড়ছে চালের দাম? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিল মালিকরা প্রতিযোগিতা করে ধান কিনছেন। আর এর ফলে ধানের ভালো দাম পাচ্ছে কৃষক।
আড়ৎদাররা বলছেন, ধানের দাম বাড়তি বলেই সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমন মৌসুমেই চালের দাম কেজিতে পাঁচ থেকে ছয় টাকা বৃদ্ধি পাওয়াটা অযৌক্তিক।
এক চাল বিক্রেতা একাত্তরকে বলেন, সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিদিনই মিল বন্ধ করে আমাদের হুমকি দিচ্ছে।
রাজধানীর বাবুবাজার, মোহম্মদপুর কৃষি মার্কেটে ও কারওয়ান বাজারের মতো বাজারে মিনিকেট ও বিআর-২৮ কেজিতে বেড়েছে ছয় টাকা। মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৬০ টাকা থেকে ৭৪ টাকা এবং বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি। এসব বাজারে কেজিতে তিন থেকে চার টাকা বেড়ে নাজিরশাইল ৬২ থেকে ৮৮ ও গুটি স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫২ টাকা কেজি। পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে আরও বেশি, ৫০ কেজির বস্তায় বেড়েছে এক হাজার টাকা।
এক বিক্রেতা বলেন, বাজারে দাম বাড়ানোর ওপর আমাদের কোনো হাত নেই। কিছু অসৎ ব্যবসায়ী, মিলমালিক, বড় বড় কোম্পানি তারা সুযোগ নিচ্ছে। সেজন্যই বস্তা প্রতি চালের দাম তিন-চারশ’ টাকা বেড়ে গেছে।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ আড়ৎদাররা বলছেন এ বছর বেশি দামে ধান কিনেছেন মিল মালিকরা। কৃষক ধানের ভালো দাম পেয়েছেন। যে কারণে বেশি দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
এক আড়ৎদার বলেন, ধান-চালের আগেরটা ছিলো। তারপরেও একটু দাম বেড়েছে। মিলাররা আরও বাড়িয়েছে। ভোক্তা অধিকার যদি ওখানে অভিযান চালিয়ে বাজারটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে আমরা এখানে ঠিক দামে বিক্রি করতে পারি।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, চলতি আমন মৌসুমে এক কোটি ৭১ লাখ ৭৮ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এর মধ্যে এক কোটি ৭০ লাখ ৯৩ হাজার টন চাল বাজারে এসে গেছে। কিন্তু ধান চালের এই ভরা মৌসুমে কোনরকম ঘোষণা ছাড়াই চালের দাম কেন বাড়লো তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
জেলার পরিস্থিতি
এমনিতেই সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম চড়া তার ওপর নতুন করে দাম বৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে চাল। সপ্তাহ ব্যবধানে কুষ্টিয়া ও চট্টগ্রামে সব রকম চালের দাম বেড়েছে কেজিতে চার টাকা। দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বিক্রেতা-চালকল মালিকরা একে অপরকে দুষলেও প্রশাসন বলছে, চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।
এক সপ্তাহ আগে কুষ্টিয়ায় এক কেজি মিনিকেট চালের দাম ছিলো ৬২ টাকা। এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬ টাকায়। একইভাবে কেজিতে তিন থেকে চার টাকা বেড়েছে সব ধরনের চালের দাম।
হঠাৎ চালের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। এই দাম বাড়ার কোন কারণ বুঝতে পারছেন না তারা।
সাধারণ এক ক্রেতা বলছেন, মোটা চালের দাম ৫২ থেকে ৬২ টাকা। বিত্তবানরা যে চিকন চাল খায় তারও দাম বেড়েছে।
আরেক ক্রেতা বলেন, আমাদের দেশে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। ব্যবসায়ী, মিল মালিকরা চাল মেশিনে কেটে চিকন করে দাম বেশি নিচ্ছে। বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
বরাবরের মত বিক্রেতাদের দাবি, ধানের দাম বৃদ্ধির কারণ মিলারদের কারসাজি। তারা বলছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে কেজিতে দুই টাকা করে বেড়েছে। বাড়ার কথাতো না। মজুততো আছে। বাহার মনিটরিং চোখে পড়ছে না। বাজার নজরদারিতে রাখা উচিত।
মিলাররা বলছেন, ধানের দাম বাড়লেও বাড়ানো হয়নি চালের দাম।

দেশ অ্যাগ্রো মিলের মালিক এম এ খালেক বলেন, আমরা চালের দাম বাড়াইনি। যদিও ধানের দাম বেশি। নির্বাচনের আগে আমরা চালের চাম বাড়াতে চাইনি। সামনে যে আমন মৌসুম আসবে ধান-চালের দাম আরও কিছুটা কমবে। সামগ্রিকভাবে চালের বাজার সহনীয় আছে। কোনো কোনো খুচনরা ব্যবসায়ী ধানের দাম বেশি শুনে চালের দাম বাড়াতে পারে। মিল পর্যায়ে দাম বাড়েনি। মিলাররা বলছে, তাদের নাকি বেশি দামে ধান কেনা লাগছে।
যারা বাজার অস্থিতিশীল করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন চালের অন্যতম বড় মোকাম কুষ্টিয়ার কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান।
তিনি বলেন, আমরা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। চালের মূল্য অহেতুক বৃদ্ধি করা যাবে না। চেম্বার অব কমার্সকে আমরা চিঠি দিয়েছি। কৃষি বিপণন আইন যাতে সবাই মানে সেজন্য সচেতন করার কাজটাও করছি।
চট্টগ্রামেও পাইকারি বাজারে কেজিতে তিন-চার টাকা বেড়েছে চালের দাম। ধান-চালের ভরা মৌসুমে এই দাম বৃদ্ধিকে সিণ্ডিকেটের কারসাজি বলছেন ভোক্তারা। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলাররা পর্যাপ্ত চাল সরবরাহ করছেন না, সেই সাথে বেড়েছে পরিবহন খরচও।
চট্টগ্রামে ইরি আতপ চালের ৫০ কেজির বস্তা গত সপ্তাহে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এখন এর দাম ২১৫০ থেকে ২১৭০ টাকা।
এদিকে অভিযানের পরও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে কমেনি চালের দাম। সকাল থেকে চট্টগ্রামের চাক্তাই চাউলপট্টি ও পাহাড়তলীর পাইকারি বাজারে তিন থেকে চার বাড়তি দামে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি চাল।
ব্যবসায়ীরা জানান, ইরি আতপ চালের ৫০ কেজি বস্তা আগে দুই হাজার টাকা বিক্রি হলেও এখন ১৫০-১৭০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ১৫০ টাকা থেকে দুই হাজার ১৭০ টাকায়। বেড়েছে জিরাসাইল, বেতি-আতপ, স্বর্ণা, নাজিরশাইলসহ সব ধরনের চালের দাম। এদিকে মিলাররা পর্যাপ্ত চাল সরবরাহ না করায় চালের দাম বেড়েছে বলে জানান চাল মালিকরা। তবে ধান-চালের এ ভরা মৌসুমে চালের দাম বৃদ্ধিকে সিণ্ডিকেটের কারসাজি বলছেন ভোক্তারা।
এদিকে চট্টগ্রামে চালের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন পাহাড়তলী বাজারে বিভিন্ন চালের আড়তে এই অভিযান চালানো হয়।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওমর ফারুক জানান, গত কয়েকদিনে হঠাৎ করেই চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এখানকার বাজারে বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা দাম বাড়ার কারণ খুঁজতেই তারা মাঠে নেমেছেন। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামে চালের আড়ত কেন্দ্রিক বড় কোনো কারসাজির খবর পাওয়া না গেলেও যেসব জেলা থেকে চাল সরবরাহ করা হয়, সেসব মিল বা মোকামে কারসাজি হচ্ছে বলে জানতে পেরেছেন তারা। এদিকে একটি দোকানে অনুমতির অতিরিক্ত চাল রাখার দায়ে দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়৷
খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, দেশে ধান উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং খাদ্যের মজুত পরিস্থিতিও ভালো। দ্বিতীয় মেয়াদে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে রোববার তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বলেন, মিলাররা প্রতিযোগিতা করে ধান কেনায় প্রতিনিয়ত চালের দাম বাড়ছে।
বাজারে ধান-চালের অবৈধ মজুতবিরোধী অভিযান জোরদার করা হবে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এ অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে খাদ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। মজুতবিরোধী আইন ইতিমধ্যে পাস হয়েছে। দ্রুত বিধি প্রণয়ন করে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
