জুলাই-আগস্ট জুড়ে দেশের দেয়ালগুলো যেন হয়ে উঠেছিল স্বপ্নের ক্যানভাস। দেয়ালে দেয়ালে ফুটে উঠেছিলো মানুষের মনের ভাষা আর বৈষম্যহীন দেশ গড়ার স্বপ্ন। উঠে এসেছিলো সাম্য মানবিক মর্যাদা আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। নীরব দেয়ালে ভাষা পেয়েছিলো গণঅভ্যুত্থানের সামনে থাকা নারীদের অধিকারের কথা। গেলো এক বছরে রাষ্ট্র কী দেয়ালের সেইসব দাবি পূরণে এগিয়ে এলো?
দেয়ালে আঁকা রঙিন ছবি আর এই স্লোগানগুলো বলেছিলো মানুষের স্বপ্ন আকাঙ্খা আর বৈষম্যহীন একটি দেশ গড়ার আকুতির কথা। কাঁপাকাঁপা হাতে শিশুরা যেমন লিখেছিলো, তেমনি কিশোর-তরুণ আর নারীরাও দেয়ালের কাছে জানিয়ে গেছে নিজেদের চাওয়ার কথা।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দিন মাস পেরিয়ে বছর পূর্ণ হলো। আবারও এলো জুলাই। রক্তাক্ত সেই জুলাইয়ে যেন ভাষা পেয়েছিলো নীরব দেয়াল। মানুষের সেইসব আকাঙ্ক্ষার পথে কতোটা হেঁটেছে দেশ ?

ছিলো ভাসানীর বাণী। ধর্ম আর দেশ মিলাতে যেয়ো না, পরে ফুলের নাম কি দিবা ফাতেমা চূড়া ? ধর্ম যার যার দেশ সবার। দেশটা সবার কতোটা সচেষ্ট হলো রাষ্ট্র ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের পানির মত ডালের মান নিয়েও ছিলো ব্যঙ্গাত্মক লেখনি।

ভাষা আন্দোলন থেকে, একাত্তর, একাত্তর থেকে ২৪ এর অভ্যুত্থান; দেশের দেয়ালগুলো নীরবে জানিয়ে গেছে মানুষের আকাঙ্খার কথা। মানুষ যেমন লিখেছিলো তার মনের চাওয়া পাওয়া তেমনি না নানা অনিয়ম নিয়েও ছিলো লেখনী।

ধর্মকে একটি গাছের সঙ্গে তুলনা করে পাতা ছিঁড়তে না চাওয়ার এই আকুতি কতোটা ধারণ করেছেন বর্তমানের বাংলাদেশ? ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী কী এক গাছের পাতা হয়ে অবস্থান করছে?

লেখা ছিলো সবাই মানবে ট্রাফিক আইন। দাবি ছিলো একজন ভিআইপির জন্য থেমে যাবে না রাষ্ট্র। সেটাও কী পূরণ হলো?

স্লোগানে মুখরিত মিছিলের অগ্রভাগে থাকা সেই নারীরা কোথায় হারিয়ে গেলো? নারীরা পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলো, সমান তালে হেঁটে ছিলো সর্বত্র। মায়েদের উপস্থিতি ছিলো দেখার মতো। দেয়ালে দেয়ালে ছিলো নারীদের নিয়ে নানা লেখা।

বাক স্বাধীনতা নারী অধিকার সাম্য আর সমতা কতোটা ফিরলো জানতে চেয়েছিলাম সমাজ আর রাষ্ট্র বিজ্ঞানীর কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলছিলেন, রাজনৈতিক দলসহ সমাজে নানা জায়গায় মেয়েদের দৃশ্যমান উপস্থিতি কমছে। যা জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যায়না।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলছিলেন, বাংলাদেশের যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে যে স্লোগানগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো দেয়ালে লিখে মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেজন্য বলা হয় দেয়াল কথা বলে। কিন্তু দেয়ালের সেই কথাগুলো সবাই শুনতে পায় না কেউ কেউ শুনতে পায় সংখ্যাটা অল্প। সর্বশেষ ২৪শের গণঅভ্যুত্থানে যে আন্দোলন তার প্রেক্ষাপটে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, যে চেতনা ছিল, যে সামাজিক বৈষম্য হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, যে বিভাজন তৈরি হয়েছিলো, রাজনীতির নামে পাঁচ আগস্ট এর পর এগুলো আর থাকবে না, এগুলাই ছিল সবার আশা।

তিনি বলেন, মতপ্রকাশ, কথা বলার অধিকার নারীর অধিকার ক্ষমতায়ন, সম্প্রীতি চর্চা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, একই রাষ্ট্রে মানুষ হিসেবে পরস্পর পরস্পরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ এবং শ্রদ্ধা সম্মানের ঐক্যের জায়গায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। আন্দোলনের সময় সব পক্ষের যে সহাবস্থান ছিল যে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ছিল পরে রাজনৈতিকভাবে তা ভাগাভাগি হয়ে গেছে। কোনো একটি আন্দোলন যখন ভাগাভাগি হয়ে যায় তখন সেখানে সাধারণ মানুষের আর কোনো স্বার্থ থাকে না। ভাগাভাগিতে যারা সংখ্যা, প্রভাব, প্রতিপত্তি আর আধিপত্যের দিক থেকে এগিয়ে থাকে তাদের ঘরেই যায় আন্দোলনের ফসল।
দিনশেষে সাধারণ মানুষকে দিশেহারা হতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওমেন অ্যান্ড স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ বলছিলেন, আন্দোলনে অসংখ্য পক্ষ ছিল এবং তারা সবাই এক হয়ে গিয়েছিলো। কিছু ছিলো জনগণের এজেন্ডা, কিছু ছিল সুসংগঠিত পলিটিক্যাল এজেন্ডা। এই পলিটিক্যাল গোষ্ঠী পরেও সুসংঘটিত ছিলো। সুতরাং তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়িত করছে। জনগণ পরে আর সংঘটিত থাকে না। তারা ওই মুহূর্তে প্রয়োজনে মাঠে নেমেছিল। সংঘটিত যে জনগোষ্ঠী আন্দোলনে ছিলো তাদের কারোরই পলিটিক্যাল এজেন্ডার ভেতরে ধর্মনিরপেক্ষতা, নারী অধিকারের বা নৃগোষ্ঠীর কথা নেই।

আন্দোলন বা সংগ্রামে নানা স্লোগানে দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ডাক আসে। কিন্তু এরপর রাষ্ট্র কী আন্দোলনের সেই মুখগুলোর কথা আর মনে রাখে?
যুগে যুগে ইট কাঠের দেয়ালে প্রতিবাদের ভাষায় রঙ্গিন হয়ে ওঠে। সমাজ ও দেশ পরিবর্তনের কথাও লেখা হয় সাদা দেয়ালের বুক জুড়ে। এসব লেখায় নির্বাক দেয়ালও সবাক হয়ে ওঠে। কিন্তু মানুষের সে ডাক আর পরিবর্তনের কথা রাষ্ট্রের কানে পৌঁছে না, দেয়ালের লেখা হয়েই রয়ে যায়।
