প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পিএসজি) টানা দ্বিতীয়বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় বিশ্বজুড়ে তাদের ফুটবলীয় প্রতিভা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং ট্যাকটিক্যাল কৌশলেরই প্রমাণ দিচ্ছে। তবে, প্যারিসের এই ক্লাবটির অন্দরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এক ভিন্ন সুর। ক্লাবের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কর্তারা ইউরোপের এই সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার পেছনে কোনো দৃশ্যমান কৌশলের চেয়ে একটি অদৃশ্য শক্তির কথা বেশি বলছেন, আর তা হলো ‘পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস’।
২০২৩ সালে যখন স্প্যানিশ কোচ লুইস এনরিকে প্যারিসে পা রাখেন, তখন তিনি তাৎক্ষণিক কোনো চাকচিক্য বা গ্ল্যামারের প্রতিশ্রুতি দেননি; বরং ক্লাবের ভেতর একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। এনরিকে এমন একটি দল গড়তে চেয়েছিলেন যেখানে ব্যক্তিগত তারকাখ্যাতির চেয়ে দলগত আত্মত্যাগ বড় হবে; যেখানে বড় বড় তারকারাও অহংকার ভুলে একসাথে রক্ষণ সামলাবে, প্রতিপক্ষকে প্রেসিং করবে এবং মাঠের কঠিন পরিস্থিতি একসাথে ভাগ করে নেবে।

টানা দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতার পর, পিএসজির খেলোয়াড়েরা এখন এনরিকেকে শুধুই একজন কোচ হিসেবে দেখেন না, বরং তাঁদের কাছে তিনি একজন দূরদর্শী স্থপতি এবং অনন্য নেতা।
গতকাল শনিবার বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকার পর শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারে আর্সেনালকে ৪-৩ ব্যবধানে হারায় পিএসজি। ম্যাচ শেষে পিএসজির মরক্কান ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি বলেন, টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা মোটেও সহজ কাজ নয়, কিন্তু আমরা তা করে দেখিয়েছি। আমাদের কোচ হলেন এই ক্লাবের প্রধান কণ্ঠস্বর। আমরা তাঁকে অন্ধের মতো অনুসরণ করি ও বিশ্বাস করি। প্রথম দিন থেকেই তিনি আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন, কোনো একক খেলোয়াড়ের চেয়ে দল সব সময় বড়। আমরা এখানে শুধু একটি দল নয়, একটি পরিবার তৈরি করেছি।

অথচ বিগত বছরগুলোতে পিএসজির চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে তারা বিশ্বসেরা তারকাদের মেলা বসাত ঠিকই, কিন্তু মাঠের খেলায় তারা ‘দল’ হয়ে উঠতে পারত না। ফলে নক-আউট পর্বের সামান্য চাপেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে ছিটকে যাওয়াটাই পিএসজির চেনা নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এনরিকে এসে সেই চেনা ছকটাই বদলে দিলেন। তিনি পিএসজির খেলায় গতি, মানসিক দৃঢ়তা এবং দলগত কাঠামোর প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ফিরিয়ে আনলেন। পিএসজি এখনো মাঠে আক্রমণাত্মক নান্দনিক ফুটবল খেলে, তবে তা করা হয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে।

অবশ্য নিজেকে ফুটবলের কিংবদন্তি ম্যানেজারদের কাতারে সামিল করতে একেবারেই নারাজ এই স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড। ম্যাচ শেষে নিজের মহিমা প্রকাশে অনীহা দেখিয়ে এনরিকে বলেন, কিংবদন্তি? ওসব নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তবে দলের পর্তুগিজ মিডফিল্ডার ভিতিনহা স্পষ্ট করেছেন, চেলসির কাছে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল হারার পর খুব কম বিশ্রাম এবং ছোট প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতির কারণে গোটা মৌসুম দল চোট আঘাত ও শারীরিক ক্লান্তিতে ভুগেছে। কিন্তু কঠিন সময়েও লুইস এনরিকে পুরো দলকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন, কৃতিত্ব তারই।

দলের কোনো খেলোয়াড়কে তাঁর নামের ওজনের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করেন না এনরিকে। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে মাঠে নামা ২০ বছর বয়সী তরুণ ওয়ারেন জাইর-এমেরির বিশেষ প্রশংসা করে তিনি বলেন, কোচ হিসেবে আমরা হয়তো ওয়ারেনের প্রতি কিছুটা অবিচার করেছি। ফাইনালে ওর শুরু থেকেই খেলার যোগ্যতা ছিল। তবে ও যে ক মিনিট মাঠে ছিল, তাতেই প্রমাণ করেছে ও কতটা স্পেশাল। উল্লেখ্য, জাইর-এমেরিই এখন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল জয়ের রেকর্ড গড়লেন।

দলগত এই শক্তির কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বড় সুপারস্টার ফরোয়ার্ডরা ক্লাব ছেড়ে চলে গেলেও পিএসজি কোনো অস্তিত্ব সংকটে পড়েনি। দলবদলের বাজারে নতুন তারকা কেনার বিষয়ে এনরিকে বেশ স্পষ্ট, আমরা জানি আমরা কোন পথে হাঁটছি। আমরা ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছি, তবে আমাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। ট্রফি জয়ের আনন্দ উৎসবের মাঝেই পিএসজি অধিনায়ক মার্কিনহোস ইঙ্গিত দিলেন তাদের পরবর্তী লক্ষ্যের। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, আমাদের এমন এক কোচ আছেন, যিনি আমাদের ট্রফির হ্যাটট্রিক অর্থাৎ তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের জন্য এখনই পুশ করা শুরু করবেন। আর ভিতিনহার মতে, দলের এই ফুরিয়ে না যাওয়া ক্ষুধার পেছনে মূল ‘অপরাধী’ আর কেউ নন, স্বয়ং লুইস এনরিকে!
