রাজাপাকসে পরিবার: জাতীয় বীর থেকে ঘৃণিত খলনায়ক

গণবিক্ষোভের মুখে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে শ্রীলঙ্কার রাজনীতি থেকে বিদায় নিলো দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী একটি পরিবার। শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব প্রায় সাত দশক ধরে। সেই ১৯৩৬ সাল থেকে এই পরিবারের সদস্যরা আঞ্চলিক বা কেন্দ্রীয় সরকারে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী।

বিশেষ করে ২০০৯ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী তামিল টাইগারদের পরাজিত করে ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যায় রাজাপাকসে পরিবার।

তাদেরকে বীর আ নায়কদের আসনে বসিয়ে দেয় লঙ্কার জনগণ। ১২ বছরের মধ্যে সেই রাজাপাকসে পরিবারই এখন লঙ্কান জনগণের গণশত্রু, সব সংকটের গোড়া।

৭০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে এই দ্বীপ রাষ্ট্র। নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে দেশটি।

ওষুধ, রান্নার গ্যাস, জ্বালানি এবং খাদ্যসহ মৌলিক জিনিসের ব্যাপক সংকট রয়েছে শ্রীলঙ্কায়। প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষের জীবন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখান থেকে ক্ষোভই পরবর্তীতে রূপ নেয় বিক্ষোভে।

দ্বীপ রাষ্ট্রটির নাগরিকদের সব ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত হয় প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তার পরিবারের ওপর।

গেলো মার্চে শুরু হয় এই পরিবারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। সেই আন্দোলন রূপ নেই গণআন্দোলন আর বিক্ষোভে। জনতার দাবির বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নেয়ায় রাজাপাকসে পরিবারের ওপর ক্ষোভ প্রতিদিন তীব্র হতে শুরু করে।

এর জেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। আগুন দেওয়া হয় তাদের পৈতৃক বাড়িতে। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনেও হামলা করে এবং তা দখল করে নেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ৭৬ বছরের মাহিন্দা রাজাপাকসে সেখান থেকে পালিয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় একটি নৌঘাঁটিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর মাহিন্দার সমর্থকরা হামলা চালানোর পর দেশজুড়ে তীব্র সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। শুধু রাজাপাকসেদের বাড়িই নয়, এক ডজনের বেশি রাজনীতিকের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। মাহিন্দা সরে দাঁড়ালেও প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের ওপর গিয়ে পড়ে রোষ। তার পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা শ্রীলঙ্কা।

কিন্তু মাহিন্দার ছোট ভাই গোতাবায়া পদত্যাগের দাবি উপেক্ষা করলে আন্দোলন আরো তীব্র হতে থাকে। নানা ধরনের কূটচালে গোতাবায়া ক্ষমতায় ধরে রাখার চেষ্টা করলে জনতার রোষ আরো বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার সরকারি বাসভবনে হামলা চালায় বিক্ষোভকারীরা। পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে মালদ্বীপ হয়ে এখন সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন গোতাবায়া

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লঙ্কার রাজনীতিতে ছিল যে পরিবারের বিরাট আধিপত্য, তাদের জন্য এটি এক বিরাট পতন। একসময় শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জাতিগোষ্ঠীর কাছে মাহিন্দা রাজাপাকসে ছিলেন বীর নায়ক। তামিল বিদ্রোহ দমনের পর যেসব বড় বড় বিজয় শোভাযাত্রা এবং জনসভা হয়েছিল, সেগুলোতে রাজাপাকসে পরিবারের বন্দনাই হতো।

মাহিন্দা ও গোতাবায়ার বাবা ডন আলউইন রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএলপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি দুই বারের সংসদ সদস্য ছিলেন। তখন দলটির নেতৃত্বে ছিলেন এসডব্লিউআরডি বান্দারানায়েক। তিনিও ফ্রিডম পার্টির আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শ্রীলঙ্কার ধনী পরিবারের সন্তান। ১৯৫৯ সালে তাকে হত্যার পর তার স্ত্রী সিরিমাভো দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৯৪ সালে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা এসএলএলপির দায়িত্ব নেন। এরই মধ্যে মাহিন্দা রাজনীতিতে দুই দশক পার করেন। কুমারাতুঙ্গা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে মাহিন্দা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজাপাকসে পরিবারের আরো দুই সদস্য বড় ভাই চামাল ও চাচাত ভাই নিরুপমা রাজনীতিতে আসেন। চন্দ্রিকা বিদায় নিলে ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট হন মাহিন্দা।

স্বাধীনতা উত্তর শ্রীলঙ্কায় তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় সিংহলি বৌদ্ধ নেতা। অনেকে তো তাকে এমন কি সম্রাট মাহিন্দা বলেও প্রশংসা করতেন।

প্রেসিডেন্ট হবার আগে মাহিন্দা সংসদে একজন বিরোধী নেতা থেকে ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। প্রেসিডেন্ট হবার পর মাহিন্দা ছোট ভাই গোতাবায়াকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিয়োগ করেন। বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেননি অনেকেই।

কারণ গোতাবায়া লঙ্কার সামরিক বাহিনী থেকে অবসরে নেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন। তার জন্য এটা ছিল এক বিরাট রাজনৈতিক উত্থান। তিনি দেশে ফিরে তার ভাইয়ের সরকারে যোগ দেন এবং বিরাট খ্যাতি অর্জন করলেন তার নিষ্ঠুরতার জন্য।

এরপর রাজাপাকসে পরিবারের আরো অনেক ভাই এবং আত্মীয়-স্বজন একের পর সরকারে যোগ দিতে শুরু করে। তবে রাজাপাকসে সাম্রাজ্যের মূল ব্যক্তি ছিলেন মাহিন্দা, বলা যেতে পারে তিনিই এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। এ পর্যন্ত দুই ভাইকে সব সময় ঐক্যবদ্ধই দেখা গেছে। কিন্তু সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনে তাদের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল দেখা যাচ্ছিলো।

২০০৯ সালে জাতিগত তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে দেশের ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানোয় তারা দুই ভাই সিংহলি বৌদ্ধদের মধ্যে বিপুল সমর্থন লাভ করেন এবং মাহিন্দা ২০১০ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কার সিংহলিজ-বৌদ্ধ সংখ্যা গরিষ্ঠদের সামরিকীকরণ শুরু হয়।

২০১৫ সালে মাহিন্দা তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সংবিধান পরিবর্তন করেন এবং দ্রুত নির্বাচন আহবান করেন। কিন্তু, তিনি মাইথ্রিপালা সিরিসেনার কাছে ব্যাপক ব্যবধানে পরাজিত হন। মাইথ্রিপালা তার সংস্কারবাদী মনোভাবের কারণে সংখ্যালঘুদের সমর্থন অর্জন করেন এবং জোট সরকার গঠনের ডাক দেন।

মাহিন্দা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী হবার চেষ্টা করেন। তখন ধারণা করা হয়েছিল, শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে তার গুরুত্ব হারাচ্ছেন।

কিন্তু, ইতোমধ্যে সিরিসেনার জোট সরকার অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে যোগ হয় ২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে জঙ্গি হামলা। ওই ঘটনা রাজাপাকসে ভাইদের জন্য যেন আশীর্বাদ বয়ে আনে।

এবার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন গোতাবায়া রাজাপাকসে। সিরিসেনা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে তিনি সেই বছরের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসেই মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন গোতাবায়া। সেই সঙ্গে মন্ত্রীসভার আরো দুই ভাই চামাল ও বেসিল এবং এক ভাইয়ের ছেলেকে যুক্ত করেন গোতাবায়া।


গোতাবায়ার ভাইয়ের ছেলে একজন রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত এবং মাহিন্দার অধীনে অর্থমন্ত্রীর পদে দায়িত্ব পালন করেন।

সম্প্রতি তিনি দেশের অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। মাহিন্দা যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন চামাল পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন এবং আরও আগে নৌপরিবহন ও বিমান মন্ত্রী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি সেচ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন।

২০২০ সালে গোতাবায়া সংবিধান সংশোধন করে পার্লামেন্টের ব্যয়ে তার অফিসের ক্ষমতা জোরদার করেন। কিন্তু যখন গোতাবায়া দায়িত্ব নেন, তখন শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ছিলো। কারণ অর্থনীতিতে ধস দ্রুত করে করোনা মহামারী। পর্যটন খাতের পতন এবং কিছু অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি ঋণের কারণে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।

এরই জেরে চলতি বছরের মার্চে শুরু হয় গণআন্দোলন। এই আন্দোলন ঠেকাতে ১ এপ্রিল অস্থায়ী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন রাজাপাকসে। বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার এবং আটক করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়। এর দু’দিন পর শ্রীলঙ্কার মন্ত্রীসভার প্রায় সবাই পদত্যাগ করেন। ফলে গোতাবায়া ও তার ভাই মাহিন্দা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের সমস্যাগুলো আরো প্রকট হয়। কারণ, অর্থমন্ত্রী আলি সাবরিকে নিযুক্ত করার মাত্র একদিন পরে পদত্যাগ করেন।

অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের পর পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান গোতাবায়া। পরে তিনি জরুরি অবস্থা তুলে নেন। শ্রীলঙ্কা সরকার নিজেদের শেষ অবলম্বন হিসেবে ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ খেলাপির ঘোষণা দেন।

৯ মে ব্যাপক সহিংসতার মুখে মাহিন্দা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং হাজারো বিক্ষোভকারী কলম্বোতে তার বাসভবনে হামলা চালায়। পরে সেনারা তাকে উদ্ধার করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন রনিল বিক্রমাসিংহে। যিনি একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক এবং আগে বেশ কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

গেলো ৯ জুলাই বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া সেনাদের সহায়তায় কলম্বোতে তার সরকারি বাসভবন থেকে পালিয়ে যান। তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিন রাতে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তারপর বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন।

আরও পড়ুন: সাত দিনের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় নতুন প্রেসিডেন্ট: স্পিকার

গোতাবায়া বিমান বাহিনীর সহায়তায় প্রথমে মালদ্বীপে উড়ে যান। পরে সেখান থেকে চলে যান সিঙ্গাপুরে। আপাতত সেখানেই আছেন। আর মাহিন্দা বর্তমানে শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি নৌ-ঘাঁটিতে তিনি অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। মাহিন্দার ছেলে ও সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী নামাল এখন কলম্বোতে তার নিজ বাসভবনেই অবস্থান করছেন।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের ভাই বাসিল রাজাপাকসে দেশটির সাবেক অর্থমন্ত্রী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে অভিবাসন কর্মকর্তারা বাধা দেন। তিনি কলম্বোর কোনো একটি স্থানে আত্মগোপনে আছেন বলে জানা গেছে। এখানে বলে রাখা ভালো, রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগে উচ্চ আদালতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।


একাত্তর/আরএ