সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে এখনও উত্তাল শ্রীলঙ্কা। বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে দেশটির রাজধানী কলম্বো। জরুরি অবস্থা ও কারফিউ উপেক্ষা করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাজপথ থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাও করে রেখেছে।
বুধবার দিনভর দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধ শতাধিক। এই মুহূর্তে বিক্ষোভকারীদের একটিই দাবি, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। সব দলের এক বৈঠক থেকেও রানিল বিক্রমাসিংহকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেয়া হয়েছে।
তবে শেষ খবর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়া রানিল পদত্যাগ করেননি। তিনি বলেছেন, সর্বদলীয় সরকার গঠনের পরেই তিনি পদ ছাড়বেন। এর আগে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক বার্তায় দেশটির জনগণকে শান্ত হবার ও আইনশৃঙ্খলা মেনে চলার আহবান জানান।
কিছুক্ষণ আগে পাওয়া এক খবরে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহে নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন করতে স্পিকার জাপা আবেবর্ধনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

এর আগে সব দলের এক যৌথসভায় দেশটির রাজনৈতিক নেতারা প্রধানমন্ত্রী রানিলকে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দিয়েছে। সেই সভায় সব দলের শীর্ষ নেতারা ছাড়াও দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান, তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধান উপস্থিত ছিলেন।
সভায় রানিলকে পদত্যাগ করে দেশ চালানোর দায়িত্ব স্পিকারের উপর ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করেন। এই সিদ্ধান্তে প্রতি সভা থেকে একমতও জানানো হয়। কিন্তু সংবিধানের কথা বলে, রানিল নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত না হওয়া পর্যন্ত পদে থাকার কথা জানান।
জনরোষ এড়াতে বুধবার অতি ভোরে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। এরপরই প্রধানমন্ত্রী রানিল অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বিক্ষোভকারীরা। মিছিল নিয়ে এসে ঢুকে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে শ্রীলঙ্কা পশ্চিম প্রদেশে কারফিউ জারি করেন। এই প্রদেশের মধ্যে রাজধানী কলম্বোও রয়েছে। তবে এসব উপেক্ষা করেই রাজপথে বেরিয়ে আসে হাজারো জনতা। তাদের মিছিলে কাঁপতে থাকে রাজধানী।
এক পর্যায়ে তারা রানিলের কার্যালয়ে ঢুকে পরে। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হলে অল্প দূরত্বে আটকে দেয় পুলিশ। এই পরিস্থিতিতে আগামী ২০ জুলাই নয়া শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে বলে বুধবার জানিয়েছেন সে দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার জাপা অবেবর্ধনে।
প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া দেশ ছাড়ার পর বুধবারই জরুরি অবস্থা জারি করা হয় শ্রীলঙ্কায়। অশান্তি ঠেকাতে রাজধানী কলম্বোসহ বেশ কিছু এলাকায় নানা বিধিনিষেধ জারি করেছে পুলিশ। যদিও তা উপেক্ষা করেই চলছে বিক্ষোভ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা আরও সহিংস হয়ে উঠছে।

এরিমধ্যে কলম্বোর রাজপথে হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়েছে। তাদের দাবি, অবিলম্বে পদ ছাড়তে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। বিক্ষোভকারীদের সামলাতে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে পুলিশ। ব্যবহার করা হয়েছে জলকামানও। বিক্ষোভকারীদের তাও দমানো যাচ্ছে না।
তাদের প্রধানমন্ত্রী বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে জুতো ছুঁড়তে দেখা গিয়েছে। সেনাবাহিনীও রাস্তায় নেমেছে। তাদের হেলিকপ্টার কলম্বোর আকাশে নিচু হয়ে টহল দিচ্ছে। কিন্তু কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না বিক্ষোভকারীরা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের সময় পুলিশের টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় জ্ঞান হারান ২৬ বছরের এক তরুণ। তাকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা নেয়ার সময় শ্বাসকষ্টের সমস্যায় মারা যান এই তরুণ বিক্ষোভকারী।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রাঙ্গণ এখন বিক্ষোভকারীতে পরিপূর্ণ। বিক্ষোভকারীরা আনন্দ–উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন সেখানে। চিৎকার–চেঁচামেচি করছেন। তাঁরা সেখানে সেলফিও তুলছেন। কার্যালয়ের ভেতরে ঢোল বাজিয়ে, চিৎকার করে নানান স্লোগান দিচ্ছেন তারা।
স্লোগানে স্লোগানে বলছেন, ‘রানিল পাগল’, ‘গোতাবায়া পাগল।’ বিক্ষোভকারীদের অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ভবনের বারান্দায় অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা সেখানে দাঁড়িয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বারান্দায় শিখা জ্বালিয়েছেন।
বুধবার বিকেলের দিকে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের সামনে বসানোর প্রথম ব্যারিকেড ভেঙ্গে ফেলেন। এ সময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ দফায় দফায় টিয়ার শেল ছুঁড়ে। সবশেষ খবর পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের সামনের রাস্তায় অবস্থান করছিলো।
এদিকে শ্রীলঙ্কার ফিল্ড মার্শাল শরৎ ফসনেকা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি কোন ধরনের বেআইনি ও অসাংবিধানিক আদেশ না মানার আহবান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জনতার প্রতি গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে গুজব আছে। এমনটা হলে পরিস্থিতি ভয়ংকর হবে।
নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর কোন ধরনের গুলি না ছুঁড়তে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি তিনি আহবান জানান। কোন অসাংবিধানিক নির্দেশ উপেক্ষার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। শরৎ বলেন, সেনাদের অস্ত্র দেশের লঙ্কার দুর্নীতিবাজদের প্রতি তাক করা উচিৎ।
আর শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জেনারেল সাভেন্দ্রা সিলভা, দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় তিন বাহিনীর সদস্যের সহযোগিতা দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। বিশেষ এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশের সম্পদ রক্ষায় সবার সচেতন থাকা উচিৎ।
শ্রীলঙ্কা অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সংকটের প্রেক্ষাপটে গত মার্চ মাসে দেশটির হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। তাঁরা লাগাতার বিক্ষোভ দেখিয়ে আসছেন। গত শনিবার বিক্ষোভকারী গোতাবায়ার বাসভবনে ঢুকে পড়ে। পরে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।
একাত্তর/এসজে
