অর্থনৈতিক অঙ্গনের কিছু কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। আমরা সোকল্ড সিভিল সোসাইটি এমনকি সাংবাদিকরা বিক্রি না হলেও, জেনে বা না জেনে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেছি-আমাদের সত্তায় স্বাধীন চিন্তার স্পেসটা সংকুচিত হয়ে গেছে। জুলিয়া আলমকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ড. সাজ্জাদ জহির। তিনি আরো বলেন, আইএমএফ থেকে কনসেশনারি ঋণ আমাদের মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জুলিয়া: দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গড় অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি? যদি করোনাকালীন পরিস্থিতির সাথে তুলনা করেন তাহলে কি বলবেন?
ড. সাজ্জাদ জহির: আমি করোনাকালে গবেষণা করেছিলাম তার আগের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন- বিভিন্ন এলাকাতে যেটা দেখেছি, শহরে যা দেখছি সেটা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দিতে পারব। আমার ধারণা বাংলাদেশ অর্থনীতি বিভিন্ন কারণে নিজের মতো করে আবার সচল হয়ে যায়। এখানে কেউ নির্দিষ্টভাবে যে জোর গলায় বলবে যে আমি করেছি তা নয়। অর্থনীতির সচলতার বড় কারণ হচ্ছে এর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশে অনেক মানুষ তারা বিদেশে কাজ করে। ১৬ কোটি লোকের দেশে পাঁচ কোটি ফ্যামিলি আর প্রতি পাঁচটা ফ্যামিলিতে একজন করে লোক যারা বিদেশে কাজ করছে। তারা ডলার, রিয়েল আয় করে। ডলারের দাম যতোই বাড়বে সেসব ফ্যামিলির আয়ও বাড়বে। আমরা যদি ঢাকার বাহিরে যাই- শহরগুলো এখন হয়ে উঠছে দোকানে ভরপুর। কন্টিনিউয়াসলি সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত কেনাবেচা হচ্ছে। তার মানে হাউজহোল্ডগুলোর যে আয়টা আসছে রেমিটেন্সে সেই আয় তারা খরচ করছে- মানে রেমিটেন্স নির্ভর এই ইকোনোমি। উৎপাদনমুখী ক্ষমতাটা আমার মনে হয় এখন দৃশ্যমান না। ইকোনোমিক জোনে বিনিয়োগ হচ্ছে আমরা শুনি কিন্তু এমপ্লয়মেন্ট জরিপ দেখিনি কতো লোক নিয়োগ পেলো। আজকের ইকোনোমি কম্পেয়ারড টু করোনা ইকোনমি- আমার কাছে মনে হয় যেন আমরা এখন যথেষ্ট ভালো। নিচের দিক থেকে দারিদ্র যদি আমরা চিন্তা করি ঢাকা শহরে ভিক্ষাবৃত্তি অনেক বেড়ে গেছে। সামাজিক অপকর্ম ছিনতাই রাহাজানি বাড়তে শুরু করেছে, পুলিশের রিপোর্টই বলছে। তাই আমার মনে হয় কর্মসংস্থান জোগাড় করার মত কর্মকাণ্ডগুলো সীমিত হয়ে আসছে।
জুলিয়া: এই পর্যবেক্ষণকে কি অর্থনীতির চলমান অবস্থা নিয়ে সরকারের দাবি ও প্রচার এবং সমালোচকদের আলোচনা- এই দুইয়ের মাঝে আপনার অভিমত বলা যাবে?
ড. সাজ্জাদ জহির: সরকারের দাবিটা কি? অর্থনীতি ভালো চলছে তাই তো? আমি ধরে নিচ্ছি প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে, সরকার বলছে ভালো অনেকে বলছে খারাপ। অবশ্য বিরোধীদল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনার বিষয়বস্তুও দেশকে এবং জনগণকে নিয়ে নাই অর্থনীতির বিষয়গুলো নিয়ে নাই। একটা মিনিংফুল ডিসকাশন যেখানে পক্ষ-বিপক্ষ আলাপ-আলোচনা করবে-আমরা বিদ্যুৎ নিয়ে কোন পথে এগুবো অথবা ঋণের ব্যাপারে আমাদের পজিশন কি হবে সেদিকেও নাই। তার মানে রাজনীতি এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে মাঝে মধ্যে কেবল প্রাইম মিনিস্টার এর স্টেটমেন্ট ছাড়া এবং বিভিন্ন মিনিস্ট্রি থেকে কিছু উইশফুল স্টেটমেন্ট ছাড়া কিছু দেখি না। অন্যদিকে বিপক্ষের কোন বক্তব্য অর্থনীতির দিক নির্দেশনার দিকেও দেখি না। আর সত্যি বলতে কি যারা সো-কল্ড আমাদের মতো সিভিল সোসাইটি অথবা আপনারা সাংবাদিকরা এদের একটা বড় অংশ জেনে হোক না জেনে হোক কোন একটা পক্ষকে নিয়ে চলছে। আমি বলবো না আমরা সবাই বিক্রি হয়ে গেছি কিন্তু আমাদের সত্তাটা স্বাধীন চিন্তার স্পেসটা নিজেরাই আমরা সংকুচিত করে ফেলেছি। আমার মনে হয় পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনাটা যদি উঠতো তখন বলা যেত আমি এই জায়গাটায় ডিফার করছি। চিন্তা ও নীতির ক্ষেত্রে কি কি ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার প্রাতিষ্ঠানিক কি কি পরিবর্তন আনা দরকার সেই আলোচনা না করে শুধু ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করলে লাভ হবে না।

জুলিয়া: গত বছরের শেষে বৈদেশিক আয় ব্যয় খাতে ভারসাম্যহীনতা এসে সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের প্রশংসাকারী পশ্চিমা মিডিয়াও লিখে 'মিরাকল ইকোনোমি ইন ক্রাইসিস। উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বে আমাদের ইমেজ কি নষ্ট হয়ে গেলো?
ড. সাজ্জাদ জহির: আমি ঠিক জানি না ইমেজ ধসে পড়েছে কিনা। এই ইমেজ গড়ে উঠেছিল ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক উন্নয়নের জন্য- প্রথমে নারীর অগ্রগতি, ক্ষুদ্র ঋণ আরো কিছু দিকে। পরবর্তীতে সম্প্রতি মেগাপ্রজেক্টে একটু চমক লাগলো-যদিও পদ্মা সেতু ছাড়া এগুলোর অর্থায়নের বিদেশ নির্ভরশীলতা আছে কিন্তু উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়। ইনফাস্ট্রাকচার উন্নয়ন আসলেই জরুরি ছিল। ইমেজটা যেটা ধসে পড়েছিল সেটা ফিনান্সিয়াল সেক্টরে মিসম্যানেজমেন্টে। বিষয়গুলো আমাদের ক্ষতি করেছে-আমরা পিকে হালদার কাহিনী জানি ডেস্টিনিসহ অনেক কাহিনী জানি। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি। আগে পরে এগুলোই আর্থিক খাতকে ঘুনের মতো খেয়েছে। এই অনিয়মগুলোই ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভে ঘাটতির ক্ষেত্রেও প্রভাব রেখেছে। তবে ইমেজ ধসে পড়ার কথা এসেছে সম্প্রতি শ্রীলংকা বাংলাদেশ হয়ে যাচ্ছে কিনা এই ধরনের আলোচনা থেকে। বড় আকারে যখন আমাদের রিজার্ভের উপর টান পড়তে শুরু করলো এবং সেটাকে নিয়ে আলাপ আলোচনা এবং আইএমএফ এর দ্বারস্থ হওয়াকে কেউ কেউ মনে করছে ইমেজ নষ্ট। আমরা মিডেল ইনকাম কান্ট্রি হওয়ার পথে আছি তখনতো আমাদের আইএমএফ এর কনসেশনারি ঋণ নেওয়ার কথা না। আইএমএফ এর ঋণ নেয়া আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে তোমরা যোগ্য না। তবে আমার কাছে মনে হয় না যে ইমেজটা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যেটা রিভাইভ করা যায় না। বরং ইমেজের চাইতে বেশি জরুরী নিজের সিস্টেমটাকে ঠিক করা। সিস্টেম যদি না ঠিক থাকে প্রফেশনালিজম না থাকে তাহলে কিন্তু আমরা বারবার মুখ থুবড়ে পড়বো।
জুলিয়া: মধ্য আয়ের পথে উঠার সময়ে আইএমএফ এর কাছে ঋণ নিলাম আমরা এই ঋণ সরকারকে এবং বাংলাদেশকে কি সুফল এবং কুফল দিবে?
ড. সাজ্জাদ জহির: আমার মনে হয় ঋণ যে কারো কাছ থেকে নেই না কেন, তার যথেষ্ট যৌক্তিকতা থাকা দরকার কেন নিচ্ছি। ঋণদাতাদের দিক থেকে আমাদের বোঝানো হয় আমাদের ঋণ না নিলে চলবে না। এমনকি ইন্ডিয়া এবং চায়নাও চাইবে যাতে আমরা তাদের পণ্যগুলো কিনতে পারি, তারাও চাইবে যে আমাদের হাতে যেন টাকা থাকে। আমাদের ভাবা দরকার যে কোন চাওয়াটাকে কমিয়ে আমরা সাশ্রয়ের দিকে যাব এবং ঋণের চাহিদাকে কমাবো। এটা কিন্তু পরিবার পর্যায়ে আমরা ভাবি আমি সরকারি পর্যায়ে সেটি আশা করেছিলাম। এই ভাবনাগুলো সরকারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের থাকা দরকার। আইএমএফ বলবে না যে ঋণ নেওয়ার আগে ভাবা দরকার। ৯৬-এ্রর পর আওয়ামী লীগ সরকার এবং শামস কিবরিয়ার সময় আমাদের বাইরে বন্ড ছাড়া নিয়েও কথা উঠতো। যে টাকাটা বন্ড ছেড়ে নেওয়া হবে সেটা তো একটা ঋণ এবং সেই ঋণটা তাদেরকেই দেওয়া হবে ইন্টারনালি যারা এটা পরিশোধ করতে পারবে ওই একই কারেন্সিতে যাতে আমাদের সরকারের উপর দায়ভারটা না আসে। সরকারের উপর দায়ভার আশা মানে জনগণের উপর দায়ভার। যেমন আদানীর চুক্তির কথা বলছিলাম এই দায় আমাদেরকে বইতে হবে। আমার নিজের এসেসমেন্ট হচ্ছে যে আইএমএফ ঋণও আর পাঁচটা ঋণের মত ভেবেচিন্তে নেওয়া দরকার। আমরা যেনো দ্রুত দেশের ভেতরে সম্পদ তৈরি করে এগোতে পারি সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। আর আমার বড় একটা ভয় হচ্ছে যে হয়তো আমরা আমদানি বিল মেটাতেই ঋণটাকে ব্যবহার করে বসবো। দেশের উন্নতির জন্য ব্যবহার হবে তা আমার কাছে মনে হয় না।

জুলিয়া: দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ কি?
ড. সাজ্জাদ জহির: একটা সময় আমরা আলাপ করতাম রাজনীতি অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি অর্থনীতি রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানে একটা আরেকটাকে ইনফ্লুয়েন্স করতে থাকে এটা আমিও একমত। এখানে বর্তমান ধারা যদি আমি চিন্তা করি দেশের ভেতরে থেকে আলোচনা করা মুশকিল। কারণ দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এখন আঞ্চলিক বিশ্ব পরিসরে সম্পৃক্ত- এটা অনেক বছর ধরেই শুরু হয়েছে, অল্প অল্প করে বেড়েছে। স্থানীয় যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে অর্থনীতি, ব্যবসা অন্যদিকে রাজনীতির অঙ্গনে-কম বেশি বাহিরের জগতের সাথে সম্পৃক্ত হয়েই চলতে হয়। এক সময় রাজনীতিতে আমরা বলতাম ন্যাশনালিষ্টিক বুর্জোয়া এগুলো আজকাল টার্মস হিসেবে ব্যবহার হয় না। এখন সর্বজনস্বীকৃত যে ব্যবসায়ীরা মূলত দখল নিয়েছে সংসদ। সংসদকে যদি রাজনীতির সেন্ট্রাল ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে চিন্তা করি তাহলে বলতে হবে যে অর্থনীতির অঙ্গনের বিশেষ কিছু কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলেছে, নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। যদি এটা প্রোডাক্টিভ হতো অর্থাৎ যে সকল ব্যবসায়ীরা দেশীয় পুঁজির ধারক বাহক সেটা গার্মেন্টসে হোক, চামড়াজাত শিল্পেই হোক অথবা আইটি সেক্টরেই হোক। তাহলে কিন্তু বড় আকারে প্রশ্ন আনা হত না। কিন্তু দেখা যায় কি ট্রেডবডিতে তারাই প্রতিনিধিত্ব করে যাদের কোনো কাজ নাই। যাদের ব্যবসায় মনোনিবেশ করতে হয় তাদের কিন্তু আবার রাজনীতি করার সময় থাকে না। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটা অংশ আসলে ক্রমান্বয়ে অধঃপতিত হয়েছে। ব্যবসা অনেকেই সৎ উদ্দেশ্যে শুরু করে- শুরুতে নিজের শ্রম দিয়ে মেধা দিয়ে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে ইজি ইজি রুট ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ করে। সেই জায়গায় রাজনীতি অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি বলব না যে ভালো ব্যবসায়ীরা বিপথে গেছে তবে অসৎ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করাটা জরুরী। আন্তঃসম্পর্ক দরকার কিন্তু সে সম্পর্কটা এমন ধরনের হওয়া দরকার যেখানে রাজনীতি এবং অর্থনীতির ভেতরে টেকব্যাক চলবে। কিন্তু রাজনীতি যদি কন্ট্রোল হয় বাইরের থেকে অর্থনীতিও যদি বাহিরের সাথে যোগসাজসে চলে তাহলে কিন্তু দুটোই অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে এবং আমার সেই জায়গাতেই আফসোস। এই ব্যাংকিং সেক্টর তাদের শুরু ভালো ছিল কিন্তু ক্রমান্বয়ে ইজি মানির চাপে পড়ে রাজনীতির সাথে কম্প্রোমাইজ করে তারা অধঃপতনের দিকে গেছে। এই জায়গাতে পরিবর্তনটা খুব ডিফিকাল্ট। তবে আমার মনে হয় রাজনীতির অঙ্গন থেকেই পরিবর্তন ইনিশিয়েট করা দরকার।
জুলিয়া: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. সাজ্জাদ জহির: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
একাত্তর/এআর
