টানা পাঁচ দিনের টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত নীলফামারী জেলার জনজীবন। গত ২৪ ঘন্টায় জেলায় এক হাজার ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়েছে। টানা বর্ষণে ব্যহত হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ায় হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাটে কমেছে জনসমাগম। এতে বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষেরা।
অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বেড়েছে তিস্তাসহ জেলার সব নদ-নদীর পানি।
এদিকে আবহাওয়া অফিস বলছে, বৃষ্টি চলতে পারে আরও পাঁচ দিন। আগামী ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর জেলায় ভারী বর্ষণের পূবার্ভাস রয়েছে।
রোববার সকাল থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত কখনো মুষলধারে আবার কখনো ঝিরঝিরে ও হালকা বৃষ্টি হওয়ায় জেলা শহরের সকল হাট-বাজার ও রাস্তাঘাটগুলো ছিল প্রায় জনশূন্য। নীলফামারী জেলা শহরের মরাল সংঘ মোড়ে দুপুরে রিকশা নিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন হাতিবান্ধা ময়দানের পাড় গ্রামের রিকশাচালক ছকমল হোসেন (৩৫) । তিনি বলেন, ‘পাঁচ দিন থাকি বৃষ্টিতে হামার কষ্ট বাড়িছে। বৃষ্টির তানে মাইনষি বাড়ি থাকি বাহির হচে না, মাইনষি বাড়িত থাকি না বাহির হইলে রিকশাত কাই ছড়িবে? হামার কামাই রোজগার কমি গেইছে বাহে। বৃষ্টিত ভিজিয়া রিকশা নিয়া সকাল ৯টার সময় বেরাইছি দুপুর দুইটা পর্যন্ত কামাই হইছে ৭০ টাকা। রিকশার জমা দিবার নাইগবে ১০০টাকা। এলা জমা দিমো কী, আর খামো কী?’
শহরের শাহিপাড়া মহল্লার রিকশাচালক ডাবলু মিয়া বলেন, ‘শহরত মানুষজন নাই, রাস্তা ফাঁকা। এখন ঘরত জমা করা টাকা পাইসাও শ্যাষ হয়া গেইছে। এইরকম বৃষ্টি আর কয়দিন হইলে ঋণ মাহাজন করি সংসার চলাইবার লাগিবে হামাক।’
দিনমজুর আব্দুস সামাদ (৪০) বলেন, ‘এমনিতে এই সময় কামের অভাব, তার উপর নাগাতার পানি হয়ছে। পানির তানে মানুষজন কাম বন্ধ করে রাখিছে। কাম না থাকায় টাকার অভাবত হামার কষ্ট বাড়িছে।’
ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে জেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়। এসব এলাকায় কোথাও কোথাও হাঁটু সমান পানি জমায় দুর্ভোগে পড়েছে মানুষজন।

নদীর পানি বাড়ছে
টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে জেলার সকল ছোট-বড় নদ-নদীর পানি বাড়লেও এখনও কোন নদ-নদীর পানি ছাড়ায়নি বিপৎসীমা। তবে ডুবে আছে মাঠ ঘাট ও খাল বিল। জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে রোববার বিকাল তিনটায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সকাল ৯টায় বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ওই পয়েন্টে নদীর পানির বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার।
ওই পয়েন্টে গত বুধবার ১১৮ সেন্টিমিটার, বৃহস্পতিবার ১১০ সেন্টিমিটার এবং শুক্র ও শনিবার ৬৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারী ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদ্দৌলা বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি কয়েকদিনের তুলনায় রোববার বিকেল তিনটায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাতে কিছুটা বেড়ে সকালের দিকে পানি কমার পূবার্ভাস রয়েছে। পানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যারেজের সব কটি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।’
নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমান বন্দর ও ডিমলা আবহাওয়া দপ্তর এবং জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘন্টায় জেলার ছয় উপজেলায় এক হাজার ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলার সৈয়দপুরে শনিবার সকাল ৬টা থেকে রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪৩৬ দশমিক ০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়েছে। যা জেলার সর্বোচ্চ।
এছাড়াও জেলার ডিমলায় ১৬১, কিশোরগঞ্জে ১৩৫, সদরে ১২৬, ডোমারে ১১০ এবং জলঢাকায় ৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়েছে।
সৈয়দপুর বিমান বন্দর আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত আবহাওয়া কর্মকর্তা মো. লোকমান হাকীম জানান, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় এমন বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এছাড়াও আগামী ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর জেলা ভারী বৃষ্টিপাত হওয়া পূবার্ভাস রয়েছে।’
