নরসিংদীর মনোহরদীর চন্দনবাড়ি গ্রামে সকাল নয়টা বাজতেই শিশুদের হাসির ঝংকার ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কেউ ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছে, আবার ছোট্ট কয়েকটি শিশুর বিভিন্ন শারীরিক কসরতে ব্যস্ত। কেউ কেউ আবার দলবেঁধে মগ্ন খেলায়। এর ঠিক দূরেই জলমহাল। যে জল কয়েক বছর আগে এই গ্রামের শিশুদের জন্য মৃত্যুর সীমানা ছিলো, আজ সেই জলের ছায়ায় জীবনের আলো জ্বেলেছে আইসিবিসি প্রকল্পের দিবা যত্ন কেন্দ্রের।
কিন্তু এই গল্প শুরু হয় অন্ধকার থেকে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৪ হাজার শিশু— অর্থাৎ দিনে ৪০ জন পানিতে ডুবে মারা যায়, যা এক থেকে চার বয়সীদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ। গ্রামাঞ্চলে এই হার আরও ভয়াবহ। কারণ মায়েরা কাজে ব্যস্ত থাকলে ছোটরা একা ঘুরে বেড়ায়। নিউমোনিয়া বা অপুষ্টির চেয়ে এটাতেই বেশি প্রাণহানি। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে বন্যা-জলোচ্ছ্বাস এই ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকার ৩২ মিলিয়ন ডলারের ইন্ট্রিগ্রেটেড কমিউনিটি বেসড চাইল্ড কেয়ার বা আইসিবিসি প্রকল্পটি অনুমোদন করে। যা ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিজ, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এবং সাইনারগসের মতো সংস্থার সহায়তায় চলে। লক্ষ্য- ১-৫ বছরের দুই লাখ শিশুর জন্য আট হাজার দিবা যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা, এবং ৬-১০ বছরের সাড়ে তিন লাখের বেশি শিশুর জন্য ‘সাঁতার-সুরক্ষা’ প্রশিক্ষণ। এটি শুধু মৃত্যু রোধ নয়, শিশু বিকাশের ভিত্তি—জীবনের প্রথম ১০০০ দিনে মস্তিষ্কের ৯০% স্নায়ু সংযোগ গড়ে তোলা।
২০২৫ সালে প্রকল্পটি তার প্রথম ধাপ শেষ করে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। ১৬ জেলার ৪৬ উপজেলায় আট হাজার ২০ কেন্দ্র চালু, যা দুই লাখ পাঁচ হাজার শিশুকে সুবিধা দিচ্ছে এবং ১৬ হাজার স্থানীয় কর্মীকে কর্মসংস্থান দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই কেন্দ্রগুলোতে শিশু রাখলে ডুবে মৃত্যুর হার ৮৮% কমে যায়। মায়েরা কাজে যেতে পারেন, পরিবারের আয় বাড়ে—যদি ১৪ মিলিয়ন শিশু কভার হয়, তাহলে প্রকল্পের খরচের চারগুণ আয় হবে।
প্রকল্পের লার্নিং ব্রিফ (২০২৫) বলছে, অনুভূমিক সম্প্রসারণ (অনেক জায়গায় ছড়ানো) সফল—কিন্তু দূরবর্তী এলাকায় অবকাঠামোর অভাব, কেয়ারগিভারদের কম বেতন (যা অনুপ্রেরণা কমায়) এবং মিটিংয়ের অনিয়মিততা চ্যালেঞ্জ। উল্লম্ব সম্প্রসারণে (নীতি-স্তরে) মন্ত্রিসমূহের সমন্বয় এখনও পুরোপুরি হয়নি এবং মনিটরিং সিস্টেম (MIS) চূড়ান্ত নয়। তবু, শিশুদের উপস্থিতি ৭৫% এর ওপর এবং অভিভাবকরা রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রাখতে রাজি। প্রকল্পটি জাতীয় ECCD নীতির সাথে যুক্ত এবং রেফারেল সিস্টেম (স্বাস্থ্য-শিক্ষা লিঙ্ক) শুরু হয়েছে।

নরসিংদীর মনোহরদীতে ৫০০ কেন্দ্রে ১২ হাজার শিশু সুবিধা পাচ্ছে, যা এলাকায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। মাসুদা বেগমের মতো মায়েরা বলেন, এখানে এসে শিশুরা বাড়ি ফিরতে চায় না—শিক্ষকরা নিজের সন্তানের মতো যত্ন নেন।
সাইনারগসের ডিরেক্টর ঈশা হোসেন বলেন, প্রায় পাঁচ লাখ শিশু সরাসরি-পরোক্ষভাবে উপকৃত এবং সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছা এর সবচেয়ে বড়ো শক্তি।
কেয়ার গিভার বা সেবাদানকারীরা আন্তরিকতা কমিউনিটি ডে-কেয়ারের সাফল্যের মূল কারণ। মনোহরদীর চন্দনবাড়ি গ্রামের কেয়ারগিভার কামরুন্নাহার নিজের জমির একটি অংশ দান করেছেন এই কেন্দ্র গড়ার জন্য। তিনি বলেন, শিশুদের সঙ্গ তিনি পছন্দ করেন। কোনো শিশুর বিকাশ অন্যদের তুলনায় ধীর দেখলে তারা সেই শিশুর বাবা-মার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলি এবং শিশুর বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিই।

শিশু যত্ন নিয়ে কাজ করা সাইনারগস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ঈশা হোসেন বলেন, এ প্রকল্প গ্রামবাসীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সবচেয়ে অনুপ্রেরণার বিষয় হলো— জনগণই এর মূল্য বুঝতে পেরেছে এবং সেখানে স্বেচ্ছায় ভূমিকা রাখছে। এই প্রকল্পে প্রায় দুই লাখ শিশু সরাসরি উপকৃত হচ্ছে, আর তাদের পরিবারের মাধ্যমে আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে—মোট হিসাবে যা প্রায় পাঁচ লাখ।
যৌথ উদ্যোগ কীভাবে বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুতোষ জীবনকে নতুনভাবে গড়তে পারে তা নতুন করে দেখায় এ প্রকল্প। প্রাথমিক শিক্ষা ও যত্নের ওপর জোর দিয়ে এই কেন্দ্রগুলো একটি সুস্থ, সক্ষম প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপনের কাজ করছে। সেটাই প্রকাশ পায় সেখানকার এক কর্মীর ভাষায়। তিনি বলেন, ‘আমরা শিশুদের জন্য শুধু এটুকুই চেয়েছি।

ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেইজড চাইল্ডকেয়ার (আইসিবিসি) প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাদির জানান, আরও ১৫ জেলায় এ প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। তিনি বলেন, যেসব এলাকার শিশুরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, দরিদ্র ও ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি—যেমন সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, বাগেরহাট, চাঁদপুর ও ভোলা। সেইসব এলাকায় আমরা কাজ করতে চাই।
কাদির যোগ করেন, প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৩৩ থেকে ৩৭ জনের দৃষ্টিতে সমস্যা থাকে। যদি পাঁচ বছর বয়সের আগে তা শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়া যায়, তাহলে আরোগ্য পাওয়া সম্ভব। তাই প্রকল্পে শিগগিরই শিশুদের চোখ পরীক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়টি যুক্ত করা হবে। কারণ অনেক শিশু সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারায়।
এই প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরেই। তবে সরকার এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শহরে ডে কেয়ার নাগরিকদের কাছে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। এখন গ্রামেও পৌঁছে গেছে জীবনরক্ষাকারী শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র।
