পৃথিবীতে ফুল আছে প্রায় চার লাখ প্রজাতির। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এতোসব ফুল থাকতে লাল গোলাপকেই কেন সময়-কাল-সংস্কৃতি নির্বিশেষে প্রেম ও ভালোবাসার চিরন্তন প্রতীকের মর্যাদা দেয়া হলো?
লাল গোলাপ সবচেয়ে রোমান্টিক ফুল হিসেবে সবার কাছে স্বীকৃত। শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে বহু কবি-সাহিত্যিক তাদের কর্মে গোলাপকে সৌন্দর্য ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন।
তবে গোলাপের এই মর্যাদা লাভের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে যেতে হবে গ্রীক পুরাণের যুগে।
কথিত আছে, ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতির প্রেমিক অ্যাডোনিসের মৃত্যুর সময় আফ্রোদিতির অশ্রু ও রক্ত যেখানে পড়েছিল, তাতেই সেখানকার মাটিতে গজানো সাদা গোলাপ রঞ্জিত হয় লাল রঙে। আর তখন থেকেই চিরন্তন প্রেমের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় লাল গোলাপ।

আফ্রোদিতি ও অ্যাডোনিস
আরেক প্রাচীন সভ্যতা রোমান যুগে সমাজের ধনীরা সৌন্দর্য ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে লাল গোলাপকে বেছে নিয়েছিলেন। সৌন্দর্যচর্চ্চায় ও সুবাসের জন্য গোলাপের পাপড়ি দিয়ে স্নান করতেন রোমান দেবীরা। পরবর্তী এই রেওয়াজ নেমে আসে বাদশাহী মহলেও।
চিকিৎসার জন্যও ব্যবহৃত হতো গোলাপের পাপড়ি। নববিবাহিতদের বিছানা গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সাজানোর চর্চা শুরু হয় এই সময় থেকেই।

গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ঘেরা রোমান সম্রাট হেলিওগ্যাবালাস (দ্যা রোজেজ অফ হেলিওগ্যাবালাস, ১৮৮৮)
খ্রিস্ট ধর্মের আগমনের প্রথম দিকে এই ধর্মের অনুসারীরা লাল গোলাপকে মাতা মেরির পুণ্য ও সতীত্বের প্রতীক হিসেবে দেখতো। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডের জাতীয় ফুলের মর্যাদা পায় গোলাপ।
এতো গেলো পশ্চিমা সভ্যতার কথা। প্রাচ্যেও গোলাপকে সমান মর্যাদা আর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
ভালোবাসা ও রোমান্সের সাথে গোলাপকে জড়িয়ে চীনে বহু পৌরাণিক কাহিনী ও উপকথা প্রচলিত রয়েছে।
হিন্দুদের ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীকে এক হাজার আটটি ছোট গোলাপের পাপড়ি ও একশ’ আটটি বড় গোলাপ দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়।
গোলাপ ফুল হৃদয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে আরব সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়।
সেখানে প্রচলিত এক গল্পে আছে, একটি সাদা গোলাপের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে নিয়ে গান গাইতে শুরু করে এক পাপিয়া।
গাইতে গাইতে সে গোলাপের এতো কাছে চলে যায় যে, গোলাপের কাঁটা বিদ্ধ হয়ে তার বুকে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। লাল রঙে রাঙা হয়ে যায় সাদা গোলাপ। আর তখন থেকেই গোলাপের রঙ হয়ে যায় লাল।
এসব পৌরাণিক কাহিনী ও ধর্মবিশ্বাসের ফলে গোলাপ ফুল ক্রমে ফুলের রাণী হিসেবে সবার মনে আলাদা জায়গা করে নেয় বলে ধারণা করা হয়।
আধুনিক যুগে গভীর আবেগ ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে ভালোবাসার মানুষটিকে লাল গোলাপ উপহার দেয়া হয়।
উনিশ শতকেও যখন পছন্দের মানুষটিকে মনের কথা খোলাখুলি বলাকে সামাজিকভাবে অশ্লীল বলে মনে করা হতো, তখন ভালোবাসার কথা বলার উপায় হিসেবে মানুষ বেছে নিয়েছিল ফুল দেয়াকে। 'ভালোবাসি' বলার পরিবর্তে একটি লাল গোলাপ পাঠালেই বিনিময় হয়ে যেতো মনের গোপন কথা।
তবে কয়টি গোলাপ পাঠানো হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেও কিন্তু বার্তার অর্থ পাল্টে যেতে পারে। যেমন, প্রথম দেখায় ভালোবাসা বোঝাতে দেয়া হয় একটি মাত্র লাল গোলাপ। আবার ক্ষমা চাওয়ার ভাষা খুঁজে না পেলে দেয়া হয় ১৫টি গোলাপের তোড়া।

পৃথিবীতে প্রায় ২৪টি বিভিন্ন বর্ণের গোলাপ পাওয়া যায়। এর সব আলাদা আলাদা অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। গোলাপি গোলাপ ব্যবহার করা হয় স্নেহ প্রকাশে, যা নতুন বন্ধুত্বের প্রতীক।
সাদা গোলাপ পবিত্রতার এবং হলুদ গোলাপ বন্ধুত্বের প্রতীক। আর কালো গোলাপকে ধরা হয় মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে। যদিও এটি আসলে কালো নয়, গাঢ় কালচে খয়েরি রঙয়ের।
একাত্তর/এসজে
