এখন শুধু ভোরের অপেক্ষা। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ত্যাগের মহিমা নিয়ে আসার ঈদুল আযহার আনুষ্ঠানিকতা। যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে মুসলিম সম্প্রদায় এই ঈদ উদযাপনে মেতে উঠবেন।
আবারও করোনা মহামারির চোখ রাঙানো এবং দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যার কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশ বিরাজ করলেও ঈদের আনন্দে তা খুব বাদ সাধতে পারেনি। ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে কোরবানির ঈদ হিসাবে খ্যাত দিনটি উদযাপনের প্রস্তুতি তাই চারিদিকে।
আরবি জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে ১০ দিন আগে থেকেই ঈদুল আজহার দিন নির্ধারিত থাকে। এ ১০ দিন নানা রকম পুণ্যকর্মের মধ্য দিয়ে কাটায় মুসলমানরা। মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় ঈদের জামাত শেষে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কুরবানি করবেন।
ঈদুল আযহার নামাজ ও পশু কোরবানির সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। কোরবানির পশু কেনা, তার যত্ন-পরিচর্যাতেই ঈদের মূল প্রস্তুতি ও আনন্দ। এরই মধ্যে সারাদেশে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। এখন সবাই ব্যস্ত কোরবানির পশু জবাই করার যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করতে।
সকালে ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিদের অনেকেই যাবেন কবরস্থানে। চিরবিদায় নেয়া স্বজনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে এই আনন্দের দিনে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে আকুতি জানাবেন।
এরপরই পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে রোববার শুরু হবে ঈদ উদযাপন। মহান আল্লাহর প্রতি প্রিয় বান্দা হজরত ইব্রাহিম ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাঈলের সীমাহীন ভক্তি, সর্বোচ্চ ত্যাগের সদিচ্ছা এবং গভীরতম আত্মসমর্পণে পরম করুণাময় সন্তুষ্ট হন এবং তিনি ইব্রাহিমকে আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ পশু কুরবানি করার নির্দেশ দেন।
এ ঘটনার পর থেকে মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রতীক হিসাবে পশু কোরবানি দিয়ে আসছেন। প্রতি বছর মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান পবিত্র হজের পরই দেওয়া হয় কোরবানি। পাঁচ দিন ধরে চলে হজের আনুষ্ঠানিকতা।
বরাবরের মতো এবারও পরিবারসমেত ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে গ্রামে ফিরছে রাজধানীর বহু মানুষ। গত কয়েক দিন ধরেই বাস, ট্রেন, লঞ্চে লাখো মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়বেন।
কোরবানির ঈদের আগে পশু কেনা, তার পরিচর্যা করার মধ্য দিয়ে যে আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, শহুরে জনপদে এবারও তা দেখা যাচ্ছে। আর গ্রামের অনেক গেরস্ত অবশ্য যত্নে লালন করা নিজের প্রিয় কোরবানির পশুটিকে শেষ সময়ে ভালোমতো খাইয়ে-দাইয়ে আরেকটু প্রস্তুত করছে।
পশু কোরবানির পরই সেটি তিন ভাগ করে দুই ভাগই বিলিয়ে দেয়া শুরু হয়। এক ভাগ নিকট আত্মীয়-স্বজন আর এক ভাগ গরিব মানুনদের বিলিয়ে দেয়ার রীতিই অনুসরণ করে থাকেন এই দেশের মুসল্লিরা। বাসা বাড়ির সামনে মাংস সংগ্রহের জন্য ভিড়ও করেন দরিদ্ররা।
দেশে আবারও করোনার প্রকোপ বাড়তে শুরু করায় কর্তৃপক্ষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। চলমান লোড শেডিং আর করোনা পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার আট দফা নির্দেশনা দিয়েছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
করোনার সংক্রমণ রোধে মসজিদ ও ঈদগাহের অজুখানায় সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঈদের নামাজে কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলা হয়েছে। এক কাতার অন্তর কাতার করতে হবে।
সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য কোনো ধরনের আলোকসজ্জা করতে নিষেধ করা হয়েছে। পশু কোরবানির ক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণেরও তাগিদ দেয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করতে বলেছে সরকার।

ঠিক ঈদের আগেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৯ জেলায় বন্যায় প্রায় ৭২ লাখ মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাদুর্গত অনেক এলাকা এখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফেরা মানুষগুলো এখন বন্যায় ভেসে যাওয়া মাথা গোঁজার ঠাঁই মেরামত করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।
তাই ঈদের দিন এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই থাকুক না কেন তাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার ডাক দিয়েছেন অনেকে। ঈদ আনন্দের উৎসব করতে গিয়ে মানুষ যেন তাদের কথা ভুলে যায়।
দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল ৮টায় প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এতে ইমামতি করবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে খতিব মুফতি রুহুল আমিন।
কোরবানি পশুর রক্ত বা বর্জ্য দিয়ে যাতে পরিবেশ দুর্গন্ধময় না হয় সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। ঈদুল আজহার পূর্ববর্তী জুমার খুৎবায় এ বিষয়ে মুসলিমদের সচেতন করতেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আযহা উদযাপিত হলেও পরের দুই দিনও পশু কোরবানি করার বিধান রয়েছে। সামর্থবান মুসলমানদের জন্য কোরবানি ফরজ হলেও ঈদের আনন্দ থেকে দরিদ্র দুঃস্থরাও বঞ্চিত হবেন না। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির সমুদয় অর্থ এবং কোরবানি দেয়া পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হবে।
