দেশে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থায় প্রান্তিক মানুষের জীবন মানে কোনো উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। দারিদ্র্য থেকে মুক্তিও দিতে পারেনি। চড়া সুদে ঋণ নিতে নারীদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো ব্যক্তিরা বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে চেনাতে এ ক্ষুদ্র ঋণকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বকে সুযোগ করে দিচ্ছে।
শনিবার রাজধানীতে সম্পাদকদের শীর্ষ সম্পাদক এডিটরস গিল্ডের ‘ক্ষুদ্র ঋণ বির্তক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এমনটাই বলেন বিশিষ্টজনরা। গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু।
এসময় বক্তারা বলেন, দেশের টেকসই উন্নয়নে ক্ষু্দ্র ঋণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে গড়ে ১০ শতাংশ মানুষও তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেনি বরং দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে আটকে গেছে। গোষ্ঠী ভিত্তিক ঋণ জামানত, চড়া সুদ, স্বল্প অর্থ এসব দিয়ে এদেশের মানুষকে আরো বেশি মানসিক ভাবে ক্ষুদ্র করে তুলছে।
এসময় বক্তারা বলেন, ক্ষুদ্র ঋণে আদায় মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় বরং এ ব্যবস্থাকে আরও ঢেলে সাজানো উচিত। এটিকে টাকা ছড়ানোর কোনো মডেল না হয়ে বরং স্থিতিশীল প্রকল্প হওয়া উচিত। এসময় ক্ষুদ্র ঋণে প্রবক্তা হিসাবে ড. ইউনূস বাংলাদেশকে তার পরিচিত বাড়ানোর অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে বলেও জানান তারা।
অর্থনীতিবিদ কাজী খলিকুজ্জমান বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল কতোটা কাজ করে? সুদের হার, ঋণ দিয়ে পরের সপ্তাহে কিস্তির প্রেশার। রবীন্দ্রনাথ আদায়ে জোর দিতে পারেনি, কিন্তু কাবুলিওয়ালা পেরেছে। ১৯৭৪ সালে ব্র্যাক শুরু করেছে। গ্রুপ ভিত্তিক কাজ, সুদের হার, জামানত নেই কিন্তু এটা জামানত নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু গ্রুপ ঋণের ক্ষেত্রে বড় ঋণ হয়ে যায় তখন এটি কাজ করে না । ক্ষুদ্র ঋণ থেকে ক্ষুদ্র চেষ্টা এটি বড় হতে দেয় না।
তিনি বলেন, সুদের হার চক্রাকারে বাড়তে থাকে। ঋণের একটা অংশ কেটে রাখা হতো। ৯০ দশকে এটি রীতিমতো ব্যবসা হয়ে গেল। এটি চললো ২০০৯-১০ পর্যন্ত।
গ্রামীন ব্যাংকের সুদ হার ২০/২২ শতাংশের কম নয়, অন্য জায়গায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। এর ফলে দারিদ্রর্য নিরসন ২০০৬ সালে মাত্র সাত শতাংশ দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পেরেছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৯ দশমিক ৪ শতাংশ দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পেরেছে-এটি আন্তর্জাতিক গবেষণা। আরেক গবেষণা বলছে, আয় বাড়েনি, ভোগ বাড়েনি। কাজেই এই গবেষণাগুলো আমলে নিলে বলা যায়, ক্ষুদ্র ঋণ যারা নিয়েছে তাদের আয় অল্প বাড়লেও জীবন যাত্রার কোনো পরিবর্তন হয়নি দারিদ্য সীমার মধ্যেই আছে। পারিবারিক ভোগও কমে গেছে কোনো কোনো দেশে। এসব কখনো সামনে আনা হয় না, মানুষ জানে না। এসময় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতি হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম বলেন, ক্ষুদ্র ঋণে নারীদের কেন টার্গেট করা হয়? পুরুষরা ঋণের অর্থ নিলে সেটি নিয়ে চলে যায় কিন্তু নারীরা নিলে তা কাজে লাগায়। নারী পালাতে পারবে না, নারীদের টার্গেট করা সহজ। নারীরা ঋণ নিলে ক্ষমতায়ন হয়েছে এটি একেবারে নয়। এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীরা ঋণ নেয়ার ঢাল হয়েছে। নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। একেকজন চারটা বিয়ে করে, একজনকে ব্র্যাক, একজনকে আশা আরেকজনকে অন্য খানে পাঠায়। তবে এখন সে অবস্থা কিছুটা পরিবর্তন হলেও মোটাদাগে যায়নি। গ্রামীণ ব্যাংকে নারীদের পাটিতে বসে। চেয়ারে বসে কর্মীরা তাদের স্যার ডাকতে হয়। ঔপনিবেশিক ধারা থেকে এটি চলে আসে। সরকারের অনেক প্রকল্প আছে সেটি নিয়ে কেন জনপ্রিয় হতে পারলো না সেটি নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত। কেন রুট লেভেলে গ্রামীন ব্যাংকের মতো এনজিওগুলো সফলতা পেলো। ক্ষুদ্র ঋণ সামাজিক সম্পর্ক ও পরিবেশ নষ্ট করছে।
অর্থনীতিবিদ আহসান মনসুর বলেন, যে অর্থ আমাদের ব্যাংক খাত পারেনি, মহাজন পারেননি সেটি এই মডেল পেরেছে। গ্রামীন বাংলার রূপ এটি। জামানত সিস্টেম তো রাখতে হবে। টাকা দিয়ে যদি টাকা ফেরত না পাওয়া যায় তাহলে তো সদকা হয়ে যাবে। সাধারণ অর্থনীতির দিক থেকে টাকা যাতে ফেরত আসে সে সিস্টেম রাখতে হবে। সামাজিক বির্বতনের কথা চিন্তা করতে গেলে, মহিলা ঋণদের যে কেউ দেবে সেটি সমাজ চিন্তাও করতে পারে না। একসেস টু ফাইনাল মূল ফান্ডামেন্টাল। এখানে ফাইন টিউনিংয়ের দরকার আছে। ক্ষুদ্র ঋণ সফল। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক খাতে নারীদের অংশ এক শতাংশ মাত্র। এগুলোতে নজর দিতে হবে। সুদের হারে কমিয়ে আনতে প্রতিযোগিতা লাগবে। কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমিয়ে আনতে হবে। ফাইন অ্যান্ড টিউনিং লাগবে।
গোলটেবিল আলোচনার সঞ্চালক একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু বলেন, ক্ষুদ্র ঋণ বিতর্ক বিষয়টি এমন যে এটি অনেক আগে থেকে প্রচলন আছে। রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে যেটি শুরু। ড. ইউনূস এটি বাংলাদেশে প্রচলন করেছে। এটি নিয়ে বির্তক আছে, আসলে এটি দারিদ্রতা ঠিক কতোটা কমাতে পেরেছে? ক্ষুদ্র ঋণকে কি পশ্চিমারা ব্যবহার করছে নাকি নারী ক্ষমতায়নের নামে পণ্য হিসাবে ব্যবহার করছেন সেটি নিয়েই আলোচনা।
