অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রতিবেশী ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য প্রমাণে ভারতের আদালতে বাংলাদেশের মামলা করা জরুরি।
টাঙ্গাইল জেলার নামে টাঙ্গাইল শাড়ি। বর্তমানে জেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের জীবিকার সাথে সম্পৃক্ত টাঙ্গাইল শাড়ি। সম্প্রতি এই শাড়িকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সে দেশটির শিল্প মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ও এই পণ্যকে দেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
চার বছরে পূর্বে টাঙ্গাইলের শাড়ির মেধাস্বত্ব দাবি করে ভারত। কিন্তু তখন টনক নড়েনি সরকারের। গেল চার জানুয়ারি ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ীকে ভৌগোলিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত সরকার। জিআই পণ্যের প্রধান শর্ত-পণ্যটির উৎপত্তি স্থল ভারত নয়, টাঙ্গাইল।
বিষয়টি জানাজানি হলে নড়ে চড়ে বসে বাংলাদেশ সরকার। তাড়াহুড়ো করে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর। এই পরিস্থিতিতে টাঙ্গাইল শাড়ির মেধাস্বত্ব ইস্যুতে করণীয় জানাতে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে সিপিডি।
টাঙ্গাইল শাড়ির স্বীকৃতি পেতে ভারতের ছল-চাতুরি এবং বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য। প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এখন সবার আগে প্রয়োজন ভারতের কোর্টেই বাংলাদেশকে বিষয়টি মোকাবিলা করা।
তিনি বলেন, অর্ধসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই করেছে। বাংলাদেশের উচিত তিন মাসের মধ্যে সেখানকার আদালতে গিয়ে মামলা করা। মেধাস্বত্ব ও ভৌগোলিক পণ্যের মর্যাদা অর্জনের মতো এ বিষয়ে সরকারের উদাসীনতার সমালোচনাও করেন তিনি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে ভারতে অর্ধসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে সেখানকার আদালতে মামলা করা। ভারতের নিজস্ব জিআই আইনে সেই মামলা করার সুযোগ আছে।

ভারতের আবেদনে নানা অসংগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বলা হয়েছে, দেশ ভাগের সময় টাঙ্গাইল থেকে হিন্দুদের তন্তুবায় সম্প্রদায় দেশত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় যায়। তারাই এই শাড়ি বানানোর সঙ্গে জড়িত। বাস্তবে টাঙ্গাইল অঞ্চলে দীর্ঘসময় ধরে শুধু হিন্দু নয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে এই শাড়ি তৈরি করে। আর বাস্তবে হিন্দুদের চেয়ে এই শাড়ি উৎপাদনের সঙ্গে মুসলিমরাই বেশি জড়িত।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কোনো পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য তার ভৌগোলিক উৎস, মান ও সুরক্ষার বিষয় জড়িত। টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই দেশ বিভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ চলে গেছেন। কিন্তু এই শাড়ির ভৌগোলিক পরিচয় তো তাতে পাল্টে যেতে পারে না। ভারতে এই শাড়িকে জিআই করতে গিয়ে প্রতারণামূলক তথ্যের ওপর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভারতের জিআই আইন অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে আপত্তি থাকলে তা করতে হবে। এখন বাংলাদেশের উচিত ভারতের আদালতে গিয়ে মামলা করা। এবং সেটা তিন মাসের মধ্যে করতে হবে। ভারত যেসব যুক্তিতে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই করেছে, সেগুলো তথ্য নির্ভর নয়। সেগুলো ধোপে টিকবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাল্লাই ভারী। কিন্তু সেটাকে কাজে লাগাতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ক্ষোভের সঙ্গে জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ির স্বত্ব নিজেদের দাবির পর এবার ঢাকাই মসলিন শাড়িরও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে চেয়েছে ভারত। ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর ‘বেঙ্গল মসলিন’ শিরোনামে-এ আবেদন করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

দেবপ্রিয় জানান, শুধু মসলিনই নয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পণ্য ফজলি আম, লক্ষ্মণভোগ, খিরসাপাতি আম, নকশিকাঁথা, রসগোল্লা, জামদানি শাড়ি, সুন্দরবনের মধুর স্বত্ব তারা নিজেদের করে নিয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই পণ্যের প্রেক্ষাপটে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের উচিত দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়া।
একইসঙ্গে মেধাস্বত্বের সব বিষয় দেশের ভেতরে ও বাইরে মোকাবেলার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে সিপিডি। সিদ্ধান্তে তড়িঘড়ি ও আইনি লড়াইয়ে অদক্ষতার কারণে দেশ তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে বাংলাদেশের নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরে গত বুধবার জিআই পণ্য হিসেবে 'টাঙ্গাইল শাড়ি'কে স্বীকৃতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)।
জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলো টাঙ্গাইল শাড়ি
টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্ব দাবি ভারতের