দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের প্রচেষ্টা চালিয়ে যারা ব্যর্থ হয়েছে তারাই নিত্যপণ্যের বাজার কারসাজিতে নেমেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দেশে দুর্ভিক্ষ ঘটানোর ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে কারসাজির মাধ্যমে যারা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে তাদেরকে গণধোলাই দিতে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়ায় আসন্ন রোজার সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের সংকট হবে না।
জার্মানির মিউনিখে তিন দিনের সফরের বিষয়ে শুক্রবার গণভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। টানা চতুর্থবারের মত সরকার গঠনের পর এটা তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন।
তিনি বলেন, নির্বাচনটা যাতে না হয়, তার জন্য একটা বিরাট চক্রান্ত ছিলো। আপনারা ২৮ অক্টোবরের ঘটনাটা একবার চিন্তা করেন। এর আগের ২০১৩ সালের সেই অগ্নিসন্ত্রাস, ২০১৩, ১৪, ১৫; এরপর আবার গত বছর ২৮ অক্টোবর। এগুলো যে হঠাৎ করে করা তা তো না, এটা পরিকল্পিতভাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা এই ধরনের নির্বাচন বানচালের পক্ষে, তারা যখন দেখললো যে, ইলেকশন কিছুতেই আটকাতে পারবে না, কারণ মানুষের একটা স্বতঃস্ফূর্ততা আছে।
‘তখন চক্রান্ত হলো যে, জিনিসের দাম বাড়বে। সরকার জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, তখন আন্দোলন করে সরকারকে উৎখাত করবে। এটা তাদের পরিকল্পনার অংশ,’ বলেন তিনি।
সরকার পতনের এক দফা দাবিতে গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশের দিন ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। রাস্তায় পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করা হয়, হামলা করা হয় প্রধান বিচারপতির বাসভবনে, হাসপাতালসহ অসংখ্য যানবাহনে দেয়া হয় আগুন।
এরপর ভোটের তফসিল ঘোষণা হলে বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করে সহিংস কর্মসূচি চালাতেই থাকে। সেসব কর্মসূচির চলার সময় বেশ কয়েকটি ট্রেনে আগুন ও ট্রেন লাইন কেটে ফেলে নাশকতায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিএনপির কর্মসূচির সময় মোট তিনশোর বেশি যানবাহন পোড়ানো হয়েছে।
ভোটে বানচালে ব্যর্থ হয়ে পণ্যমূল্য যারা বৃদ্ধি করছে তাদের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “কাদের (পরিকল্পনা) সেটা আপনারা ভালো বোঝেন। আমি আর কারো নাম বলতে চাই না, বলার দরকারও নেই। কিন্তু এই চক্রান্তটা আছে।’

গণধোলাই দেওয়া উচিত
দেশে ব্যাপক ফসল উৎপানের পারও যারা পরিকল্পিতভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছে তাদেরকে গণধোলাই দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক সময় তো বাংলাদেশে অভাব হলে বললো পেটে ভাত নাই। এখন কি সেই কথাটা বলে? বলে না?
শেখ হাসিনা বলেন, এখন কী বলে? ডিমের দাম, পিঁয়াজের দাম, মুরগির দাম, গরুর মাংসের দাম, অথবা পাঙ্গাশ মাছের পেটি খেতে পারছে না, এই তো? এটা কি একটা পরিবর্তন না? ১৫ বছরে তো এই পরিবর্তনটা এসেছে।
কিন্তু ১৫ বছর আগে কী ছিলো এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ভাতের জন্য হাহাকার ছিলো। একটু নুন ভাত, ভাতের ফ্যান চাইতো, এখন তো ভিক্ষা চায় না।
ডিম লুকিয়ে রেখে দাম বাড়ানোর বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার কি এটা মনে হয় না, এই যে যারা সরকার উৎখাতের আন্দোলন করে, এখানে তাদেরও কিছু কারসাজি আছে?
তিনি বলেন, এর আগে এরকম পিঁয়াজের খুব অভাব। দেখা গেলো বস্তাকে বস্তা পচা পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছে। এই লোকগুলিরে কি করা উচিত? সেটা আপনারাই বলেন। এদের গণধোলাই দেওয়া উচিত।
‘কারণ আমরা সরকার কিছু করতে গেলে বলে, সরকার করছে। তার থেকে পাবলিক যদি এটার প্রতিকার করে তাহলে আর কেউ কিছু বলতে পারবে না,’ বলেন তিনি।
সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়ায় আসন্ন রোজার সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের সংকট হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, রমজানে কোনো কিছুর (অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের) অভাব হবে না। ইতোমধ্যেই সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো সমস্যা হবে না।
‘ছোলা, খেজুর, চিনিসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। সুতরাং, এটি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ আমরা অনেক আগেই এর জন্য ব্যবস্থা করেছি,’ আশ্বস্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
ষড়যন্ত্র ছিলো, এখনো আছে
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সব সময়ই ষড়যন্ত্র ছিলো এবং তা এখনো রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের পরিকল্পিতভাবে দুর্ভিক্ষ ঘটানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেটা বলছেন, মার্চে দুর্ভিক্ষ। হ্যাঁ ষড়যন্ত্র তো ছিলো, ষড়যন্ত্র তো আছে। আপনারা জানেন, আমি আসার পর থেকে বার বার আমাকে বাধা দেওয়া, ক্ষমতায় যেনো না যেতে পারি।
‘আপনি ৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার ঘটনাই ধরেন না কেন, রাসেলকেও তো ছাড়েনি! কেন? যেনো ওই রক্তের কেউ বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে,’ বলেন তিনি।
সেদিনে ছোট বোন শেখ রেহানাসহ বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিরে এসে দায়িত্ব নিয়েছি। আমার চেষ্টাই হচ্ছে, যে স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছেন, সেটাকে পূরণ করা।
‘সেই ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র প্রত্যেকবারই হচ্ছে, বারবার… আজকে মানুষের ভোটের অধিকার, আমরাই আন্দোলনের মাধ্যমে সেটা প্রতিষ্ঠিত করেছি, গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে এনেছি, তার শুভফল দেশবাসী পাচ্ছে,’ বলেন তিনি।

যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ
ফাগুনের শুরুতেই দেশে বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি হওয়ায় খাদ্যপণ্য উৎপাদনে কোনো ক্ষতি হবে না বলে মন্তব্য করেছেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, এই কথাটা আমি বলতে পারি, এই যে কালকে বৃষ্টি হল না! কথায় তো আছে, ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজা পুণ্য দেশ’। মাঘের শেষে কিন্তু বৃষ্টি হলো। আবার এই ফাল্গুনের শুরুতেও কিছু বৃষ্টি।
‘আমের মুকুলগুলি আবার তরতাজা হয়ে উঠছে। ক্ষেতে কেবল ধানের চারা রোপণ, সেখানেও সেচের আর প্রয়োজন হবে না এই বৃষ্টি যদি ভালোভাবে হয়। মাটির ময়েশ্চার বাড়বে, ফসল ভালো হবে। ফুলের হয়তো একটু ক্ষতি হবে, কিন্তু খাদ্যপণ্য উৎপাদনের কোনো অসুবিধা হবে নাম,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, হ্যাঁ পেঁয়াজ আমাদের যথেষ্ট উৎপাদন হচ্ছে এবং সেটা আমরাই শুরু করেছি। বীজ উৎপাদন শুরু করেছি এবং কোন কোন এলাকায় পেঁয়াজ হয় সেটাও খুঁজে বের করেছি।
‘যখনই কোভিড অতিমারি দেখা দিলো। সারাবিশ্বে যখন লকডাউন আসলো, পণ্য পরিবহণ বাধাগ্রস্ত হলো, তখন থেকেই কিন্তু আমি বলে যাচ্ছি, আমাদের নিজেদের খাদ্য নিজেদের উৎপাদন করতে হবে।’
এক ইঞ্চি জমি যেনো অনাবাদি না থাকে এবং সেটা শুধু বলা না, কার্যকরও করেছি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্পর্ক আরো দৃঢ়, নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে
গত সপ্তাহে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুপ্রতীম দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিউনিখে আমার এই ফলপ্রসূ সফরের ফলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও সর্বাঙ্গীণ নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার বলিষ্ঠ রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের আকার নয় বরং নীতির শক্তিতেই যে মানবতার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তি, এবারের সম্মেলনে আমি এই বার্তাই বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছি।
‘পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকসমূহের মাধ্যমে বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাথে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হয়েছে এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে,’ বলেন শেখ হাসিনা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলোনস্কিকে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কিন্তু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছি যে, যুদ্ধটা কীভাবে বন্ধ করা যায় সেটা বলেন। সকলেই কষ্ট পাচ্ছে।
‘আমার ওইটাই প্রশ্ন সব জায়গায়। আমার যদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও দেখা হয়, আমি একই কথা বলবো যে, আমি যুদ্ধ চাই না। আপনি যুদ্ধ বন্ধ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমার কথা আমি বলে যাবো। তারপর যে যেটা বোঝে বুঝুক। আমার কিছু যায় আসে না।
গণধোলাই দেওয়া উচিত: শেখ হাসিনা
‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ’
সম্পর্ক আরো দৃঢ়, নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী 