বন্যা পরিস্থিতি ও বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দিনভর বিক্ষোভ ও দাবি আদায়ের লড়াইয়ে নেমেছে পরীক্ষার্থীরা। সোমবার দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। দাবি আদায় না হলে আগামীতে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জড়ো হতে শুরু করে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। উত্তরা, মিরপুর, সায়েন্সল্যাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর পার হয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যখন চানখাঁরপুল দিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের দিকে এগোতে চায়, তখন পুলিশ তাদের পথ রোধ করে। এ সময় পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি ও ধাক্কাধাক্কি চলে।

পরে শিক্ষার্থীরা কিছুটা পিছিয়ে এলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেয়। আলোচনার পর অনেক শিক্ষার্থী স্থান ত্যাগ করলেও কিছু অংশ নীলক্ষেতে অবস্থান নেয় এবং পরে তারাও সরে যায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কয়েকজন আন্দোলনকারীর আইডি কার্ড পরীক্ষা করে এবং তাদের কাছে ‘ভুয়া পরিচয়পত্র’ পাওয়ার দাবি তুলে তাদের ছাত্র পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধের কারণে প্রায় আধঘণ্টা যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। অন্যদিকে, উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনের রাস্তাটি সারাদিনই শিক্ষার্থীদের অবরোধে অচল হয়ে ছিল। স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা দীর্ঘ চেষ্টা করেও উত্তরার রাস্তা থেকে শিক্ষার্থীদের সরাতে ব্যর্থ হন। দুপুর নাগাদ সায়েন্সল্যাব ও নীলক্ষেত এলাকা ফাঁকা হলেও উত্তরার সড়ক ছিল স্থবির।
রাজধানীর বাইরেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

দুপুরে চট্টগ্রামে ষোলশহর শিক্ষাবোর্ডের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের দাবিসহ অন্যান্য দাবি উত্থাপন করেন তারা। শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির কারণে মুরাদপুর ও ২ নম্বর গেটসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
বরিশালের নথুল্লাবাদে শিক্ষাবোর্ডের সামনে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় শিক্ষার্থীরা। এতে করে মহাসড়কে দীর্ঘ সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। অন্যদিকে, খুলনার শিববাড়ী মোড় ও বিএল কলেজ এলাকায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের করে পরীক্ষার্থীরা। তারা বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখার দাবি জানান।
দিনাজপুরে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা দিনাজপুর-ফুলবাড়ী মহাসড়ক অবরোধ করলে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আহত হন। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কাছে সড়ক ও রেল ক্রসিংয়ে অবস্থান নিলে কয়েক ঘণ্টা ধরে সব ধরনের যান চলাচল অচল হয়ে পড়ে।

বগুড়া শহরের সাতমাথা মোড়ে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের পর শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে তাদের তিন দফা দাবি তুলে ধরেন এবং একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। এছাড়া, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে পরীক্ষার্থীরা। এর ফলে উত্তরবঙ্গগামী লেনে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
আর, যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়ার আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
সারাদেশে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মূল দাবি তিনটি, যার মধ্যে প্রধান দাবিটি হলো বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলসমূহে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা এবং নতুন করে পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
