বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ‘অনন্য মাইলফলক’ জুলাই গণঅভ্যুত্থান। অসীম সাহসী ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনে পতন ঘটে দীর্ঘ দেড় দশকের প্রতাপশালী স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার। রাজপথ রঞ্জিত হয় হাজারেরও বেশি ছাত্র-জনতার তাজা রক্তে, যার বিনিময়ে মুক্তি পায় দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের এই সফল বিপ্লব অনেকের কাছে আজ ‘বাংলার বর্ষ বিপ্লব’ হিসেবে পরিগণিত।

আন্দোলনের শুরু ও ‘বাংলা ব্লকেড’
২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ২০১৮ সালে বাতিল হওয়া কোটা ব্যবস্থা উচ্চ আদালতের রায়ে বহাল হলে ছয় জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ডাক দেয়। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই সঙ্কটের স্থায়ী সুরাহার দাবিতে শুরু হওয়া এই ব্লকেডে স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। দ্রুতই এই আন্দোলন ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

সেই বক্তব্য এবং রাজপথে প্রথম রক্ত
১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। ওই দিন মাঝরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে স্লোগান ওঠে—‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার/ চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার।’
এই প্রতিবাদের জের ধরে ১৫ জুলাই সকালে হেলমেটধারী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা লাঠি, রড ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। মুহূর্তেই শিক্ষাঙ্গনগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পরদিন ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে পুলিশের বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে দেন। তার এই আত্মত্যাগ আন্দোলনের প্রতীকী রূপ নেয়। একই দিন চট্টগ্রামে প্রাণ হারান ছাত্রদল কর্মী ওয়াসিমসহ সারাদেশে মোট ছয় জন। ১৭ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগ হল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও মীর মুগ্ধর আত্মত্যাগ
১৮ জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করে। আন্দোলন দমাতে সরকার পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাস ও নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। এই দিন রাজধানীর আজমপুরে আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণ করতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান মীর মুগ্ধ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে পুরো দেশকে অন্ধকার গুহায় নিক্ষেপ করে। ১৯ জুলাই দেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংসতম দিন প্রত্যক্ষ করে মানুষ। ওই দিন প্রাথমিক হিসাবেই ৬৬ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান এবং দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে সেনা মোতায়েন করা হয়। ২০ জুলাইও ঝরে আরও ২৫টি তাজা প্রাণ।

দেয়ালচিত্র, নিষিদ্ধের রাজনীতি ও লাল প্রোফাইল
কারফিউ ও সেনা টহলের মাঝেই ‘জেন-জি’ তরুণরা শহরের দেয়ালগুলোতে প্রতিবাদের গ্রাফিতি আঁকা শুরু করে। ২১ জুলাই সর্বোচ্চ আদালত কোটা সংস্কারের রায় দিলেও ততক্ষণে আন্দোলন একদফা অর্থাৎ খুনি সরকারের পতনের দাবিতে রূপ নেয়। আন্দোলন ভিন্নখাতে নিতে ২৯ জুলাই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে সরকার এবং ৩০ জুলাই রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। তবে ছাত্র-জনতা এই ভন্ড শোক প্রত্যাখ্যান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রোফাইল লাল রঙে রাঙিয়ে দেয়।

একদফা আন্দোলন ও চূড়ান্ত বিজয়
৩১ জুলাই থেকে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও ‘দ্রোহযাত্রা’র মতো কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষক, অভিভাবক, ব্যবসায়ী ও সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। তিন আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। চার আগস্ট অসহযোগের প্রথম দিনেই সরকারের শেষ মরণকামড়ে দেশজুড়ে শতাধিক মানুষ গুলিতে নিহত হন। কিন্তু বুলেটের ভয় জয় করে লাখো জনতা শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে স্বৈরাচারের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—পাঁচ আগস্ট। ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকার প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী ও আবদুল্লাহপুরে লাখ লাখ মানুষের হুংকার শোনা যায়। লক্ষ্য একটাই—গণভবন। কোটি মানুষের এই গণজোয়ারের মুখে অবসান ঘটে দীর্ঘ অন্যায়ের। প্রাণ বাঁচাতে ক্ষমতা ছেড়ে গণভবন থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা।

হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ ক্যালেন্ডারের পাতা ছাড়িয়ে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘৩৬ জুলাই’। বিকালের সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছিরো, বাংলার আকাশে তখন উদিত হয়েছিলো এক নতুন স্বাধীন সূর্য; আর দেয়ালে দেয়ালে হাসছিলো তরুণদের আঁকা বিজয়ের গ্রাফিতি।
