জলবায়ু পরিবর্তন: খেলার মাঠ নয়, মৃত্যু ঝুঁকির ঘেরাটোপে শৈশব

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৫, ০৮:৪১ পিএম

তপ্ত দুপুর। আগুন গরম বাতাসে চারপাশ নিস্তব্ধ। বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে গাছের নিচে ঘুমিয়ে আছে চার বছরের লাবিবা। সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় স্থানীয় শিশুযত্ন কেন্দ্র ‘আঁচল’ বন্ধ। খেলার সাথীরা কেউ নেই। এমন ছুটির দিনগুলোতে লাবিবাকে নিয়ে চিন্তায় থাকেন মা রেশমা বেগম। আবার অতিরিক্ত গরম পড়লে সরকারি সিদ্ধান্তেও ‘আঁচল‘ বন্ধ রাখা হয়। গতবছরের মত এবারও এমন হতে পারে এই আশংকায় রেশমা বেগম হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘আঁচল খোলা থাকলে আমি নিশ্চিন্তে ঘরের কাজ আর মাঠের কাজ করতে পারি। গত বছর গরমের কারণে যখন আঁচল বন্ধ ছিল তখন মেয়েটাকে দাদীর কাছে রেখে কাজে গিয়েছি। এবার আঁচল বন্ধ হলে কী করব!’ শুধু রেশমা নয়, এমন আতঙ্ক এখন হাজারো মায়ের। কারণ স্কুল ও আঁচল ছুটির এই সময়টাতেই তো গতবছর পাশের দুই গ্রামের দুই শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে।  

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এক সময়ের চেনা ঋতুগুলো আজ কেমন অচেনা লাগে। সময়মতো বৃষ্টি নেই, বরং অসময়ে ঝড়, হঠাৎ শিলাবৃষ্টি বা তীব্র তাপদাহ।  রমজান ও ঈদের ছুটির পরে গতবছর যখন স্কুল খোলার কথা, তখনই শুরু হয় তীব্র তাপপ্রবাহ।  অতিরিক্ত তাপ প্রবাহের কারণে ২১ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৪ পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয় শিশুযত্ন কেন্দ্র ‘আঁচল’। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পড়েছে শিশুদের ওপর। স্বাস্থ্য ঝুঁকি, মানসিক চাপ, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা ও বেঁচে থাকার নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েই চলেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে। 

জলবায়ুর এই উন্মত্ত আচরণ কেবল শিক্ষাকে ব্যাহত করছে না, বরং শিশুর জীবন রক্ষায় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন পানিতে ডুবে মারা যায়, যাদের মধ্যে ৪০ জন শিশু। পৃথিবীব্যপি পানিতে ডুবে মৃত্যু ‘নীরব মহামারী’ হিসেবে এটি চিহ্নিত।

এ বাস্তবতায় সিআইপিআরবি চালু করেছে শিশুযত্ন কেন্দ্র ‘আঁচল’। এখানে ১ থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে রাখা হয় দু’জন প্রশিক্ষিত যত্নকারীর তত্ত্বাবধানে। গবেষণায় প্রমাণিত, আঁচল পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি ৮২ শতাংশ পর্যন্ত কমায়। তাই তো, তাপদাহে এই আঁচল কেন্দ্র বন্ধ হলে ছোট্ট লাবিবা কিংবা তার মতো হাজারো শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে বহুগুণ। অভিভাবকের কপালে দেখা দেয় চিন্তার ভাঁজ।  

শিশুদের এ বিপদ থেকে রক্ষা করার উপায় কী? সমাধান দু’ভাবে হতে পারে। প্রথমত, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক কার্বন নিঃসরণ কমানো সহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সবাইকে সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে চলার পরীক্ষিত ও সহজ পথ খুঁজে বের করতে হবে। 

দ্বিতীয় বিষয়টিতেই জোর দিচ্ছে সিআইপিআরবি। ‘নিরাপদে ভাসা’ নামে একটি নতুন প্রকল্প জানুয়ারি ২০২৫ এ শুরু হয়েছে। শিশুদের ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ কাজে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সাথে স্থানীয় মানুষ কীভাবে খাপ খাইয়ে চলতে পারে সে বিষয়ে প্রকল্পের আওতায় গবেষণা করা হবে । প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন এবং প্রিন্সেস শার্লিন অব মোনাকো ফাউন্ডেশন।

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে আর একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর পদ্ধতি হলো ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের ‘জীবনের জন্য সাঁতার’ শিক্ষা কার্যক্রম। শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে এটি ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। এর আওতায় নিজের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি পানিতে ডুবে গেলে কীভাবে অন্যকে উদ্ধার করতে হয় সে কৌশলও শেখানো হয়। একইসাথে স্বেচ্ছাসেবীদের শেখানো হয় কীভাবে ডুবে যাওয়া ব্যাক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যায়।

বাংলাদেশ সরকার ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রকল্প’নামে তিন বছর মেয়াদী (২০২২-২০২৪) প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে সেটি আরও এক বছর বৃদ্ধি করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্প প্রায় একইভাবে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো সম্ভব, ঠেকানো সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন আর শিশুমৃত্যু এই দুইয়ের যোগসূত্র আজ অপ্রত্যাশিত এক বাস্তবতা। এর সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। পানিতে ডুবে আর একটি শিশুর মৃত্যুও কাম্য নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ্য এ মৃত্যু ঠেকাতে মানুষকে সচেতন করতে হবে, সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। আজকের শিশুটিই একদিন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। জলবায়ুর পরিবর্তিত এ নতুন বাস্তবতার উপযোগী কৌশল খুঁজে বের করে তা কাজে লাগানোর এখনই সময়।

লেখক: মো: আবুল বরকাত, উপ-পরিচালক, সিআইপিআরবি। যোগাযোগ- [email protected]

একাত্তর/এসি
স্পেনের কাছে ১-০ গোলে বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে কেবল শিরোপাই হাতছাড়া করেনি আর্জেন্টিনা, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সম্মানও বিসর্জন দিয়েছে তারা! ম্যাচের পর স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিক আক্রমণ এবং ট্রফি...
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের বিচার বিদ্যমান সেনা আইনেই পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে সাজাপ্রাপ্ত এক নারী কয়েদি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কারাগারের জেলার শিরিন আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সরকার।
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর