এশিয়ার বুকে বাংলার গর্ব: বৃহত্তম পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজারের জীবন্ত মহাকাব্য

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৫, ১০:৩০ পিএম

বাংলার হৃদয়ে লুকিয়ে আছে এমন এক জলজ জনপদ, যার নাম উচ্চারণমাত্রই জাগে নদীর কলতান, পেয়ারার সুবাস আর ভাসমান জীবনের রূপকথা। ভিমরুলী, আটঘর, কুরিয়ানা—বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশালের সীমান্তে অবস্থিত এই ত্রিকোণীয় জলাভূমিই এশিয়ার বৃহত্তম পেয়ারা বাগানের লীলাভূমি। প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই বাগান কেবল কৃষি উৎপাদনের মাঠ নয়, এটি একটি সমগ্র সভ্যতার প্রতীক, যেখানে প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার।

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এই জনপদের জীবনযাত্রায় শুরু হয় এক মহাযজ্ঞ। প্রায় ত্রিশ হাজার কৃষক তাদের ডিঙি নৌকা বেয়ে পৌঁছে যান বাগানে, যেখানে লক্ষাধিক পেয়ারা গাছের শাখা ফলভারে নুয়ে পড়েছে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে এই অঞ্চল পরিণত হয় এক স্ফটিকসবুজ সাম্রাজ্যে। কিন্তু এখানকার প্রকৃত বিস্ময় লুকিয়ে আছে বিকেলের আড়ালে—ভিমরুলী ভাসমান বাজারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার একক ও অনন্য দৃষ্টান্ত। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত খালের বুকে জমে ওঠে শতাধিক নৌকার সমারোহ। প্রতিটি নৌকাই এক চলন্ত বাজার—কৃষক নিজেই বিক্রেতা, কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর অনুপ্রবেশ নেই এখানে। চোখের সামনেই দরকষাকষি, হাসিমুখে লেনদেন, আর নৌকার তলদেশে সাজানো থাকে পেয়ারার পাহাড়। শুধু পেয়ারা নয়, মৌসুমভেদে চালতা, আমড়া, কাঁঠাল, এমনকি শাকসবজিও ভেসে ওঠে এই জলের বাজারে।

এই ভাসমান ব্যবস্থার অর্থনৈতিক শক্তি অপরিমেয়। প্রতিদিন এখানে কেনাবেচা হয় প্রায় একশত টন পেয়ারা, যা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের দূরতম জেলায় পৌঁছে যায় পরিবহন শ্রমিকদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। প্রথাগত পদ্ধতির এই চাষাবাদে এখন যোগ হচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় জৈব চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, পাশাপাশি নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে ফল সংগ্রহ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। স্থানীয় কৃষি সমবায় সমিতির তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে নারী অংশগ্রহণ বেড়েছে ৪০%, যা কেবল উৎপাদনই বাড়ায়নি, নারীর আর্থ-সামাজিক মর্যাদাও রূপান্তরিত করছে।

ভাসমান এই বাজার আজ পর্যটনের ম্যাগনেট। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন এই প্রাকৃতিক অলৌকিকতা দেখতে। থাইল্যান্ডের দ্যামনোয়েন সাদুয়াক বাজারের সঙ্গে তুলনা হলেও ভিমরুলীর স্বকীয়তা অন্য মাত্রায়। এখানে বাণিজ্যিক চাকচিক্য নয়, গ্রামীণ জীবনের অকৃত্রিম সৌন্দর্য প্রধান আকর্ষণ। বাংলাদেশ পর্যটন উন্নয়ন কর্পোরেশন ইতোমধ্যে "ভিমরুলী ভাসমান বাজার" ব্র্যান্ডিং করে এটিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে স্থান দিয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়—পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব ট্রলার সার্ভিস এবং স্থানীয় পণ্যের বাজারজাতকরণ এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

এই জনপদের গভীরতর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে তার পরিবেশ-সহিষ্ণু দর্শনে। এখানকার মানুষ নদীকে শত্রু ভাবেন না, বরং তাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকার কৌশল রপ্ত করেছেন। পেয়ারা গাছের শেকড় মাটির ক্ষয় রোধ করে, ভাসমান বাজার প্লাস্টিকবর্জ্য সৃষ্টি করে না, এবং সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন ফুটপ্রিন্ট নগণ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে ভিমরুলীর মডেল বিশ্ববাসীকে শেখায় কিভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

ভিমরুলী কেবল পেয়ারার দেশ নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতির এক জীবন্ত আর্কাইভ। যখন কোনো কৃষক নৌকায় ভরে পেয়ারা নিয়ে খাল পাড়ি দেন, যখন পাইকারের ডাকে মুখরিত হয় নদীর জল, অথবা যখন কোনো পর্যটক নৌকায় বসে পেয়ারার মিষ্টি ঘ্রাণে বিমোহিত হন—সেই মুহূর্তগুলোই রচনা করে বাংলার এক নতুন লোককাহিনী। এই জনপদ প্রমাণ করে, একটি সাধারণ ফলও পারে এক সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে, সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করতে, বিশ্বদরবারে একটি জাতির গর্বের পরিচয় বহন করতে। ভাসমান এই জীবনকাব্য আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মন্ত্র—যেখানে জল বাধা নয়, বরং সম্ভাবনার অবারিত পথ।


লেখক:  ডেপুটি রেজিস্টার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

একাত্তর/এসি
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাবে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ থাকলেও তা নিরসনে সরকার বিকল্প বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি...
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের বড় অর্জনের দিন আজ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেদের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর