১৯৪৭ সালে দেশভাগের প্রাক্কালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মারাত্মক যক্ষ্মা রোগের খবর অত্যন্ত গোপনে রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ মুম্বাইভিত্তিক (তৎকালীন বোম্বে) দুই ভারতীয় পার্সি চিকিৎসককে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের পুরস্কার কমিটির প্রধান এবং পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আহসান ইকবাল সামাজিক মাধ্যম এক্সে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। মনোনীত দুই চিকিৎসক হলেন চিকিৎসাবিদ ড. জল রতনজি প্যাটেল এবং রেডিওলজিস্ট ড. জল ধাইভো-কু।

১৯৪৬ সালে ড. প্যাটেল এবং ড. ধাইভো-কু জিন্নাহর বুকের এক্স-রে পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, তিনি জটিল ও অন্তিম পর্যায়ের যক্ষ্মা রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকরা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর আয়ু আর মাত্র এক থেকে দুই বছর বাকি রয়েছে। তবে, পেশাগত গোপনীয়তার সর্বোচ্চ নীতি বজায় রেখে তারা এই তথ্য জিন্নাহর নিকটতম অভ্যন্তরীণ বৃত্তের বাইরে কারোর কাছে প্রকাশ করেননি। আহসান ইকবাল তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, পেশাগত শপথের প্রতি এই চিকিৎসকদের অনড় নিষ্ঠা অঘোষিতভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরিতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল।
ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, জিন্নার এই মরণব্যাধির খবর প্রকাশ পেলে ভারত ভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির সময়ক্রম ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারত। ব্রিটেনের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন পরবর্তীকালে স্বীকার করেছিলেন, তিনি যদি আগে থেকে জিন্নাহর স্বাস্থ্যগত সংকটের কথা জানতেন, তবে তিনি হয়তো দেশভাগ পিছিয়ে দিতেন। ফলে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত এবং পাকিস্তান গঠন হয়তো সম্ভবই হতো না।

ইতিহাসবিদ আকবর আহমেদের গবেষণা গ্রন্থ ‘Jinnah, Pakistan and Islamic Identity: The Search for Saladin’ অনুযায়ী, জিন্নাহ ১৯৩০-এর দশক থেকেই যক্ষ্মা রোগে ভুগছিলেন। তৎকালীন সময়ে কার্যকর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক না থাকায় রোগটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ছিল। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও নেতৃত্ব যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেজন্য জিন্নাহ তাঁর এই শারীরিক অবস্থার কথা শুধু বোন ফাতেমা জিন্নাহসহ গুটিকয়েক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। দেশভাগের পর তাঁর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে এবং ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, পাকিস্তান স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর ৭৮ বছর পর দুই পার্সি চিকিৎসকের এই নিঃশব্দ অবদানকে স্মরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৭ সালের মার্চ মাসে মরণোত্তর এই সম্মাননা প্রদান করা হবে।
