পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের সূচনা হয়েছিলো, হাজার কোটি ডলারের এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলো নাসা। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের একটি যান গ্রহাণু থেকে নমুনা নিয়ে সাত বছরের মিশন শেষে এখন পৃথিবী ফিরেছে। রোববার স্থানীয় সময় সকাল ন’টার দিকে এ মহাকাশযান আমেরিকার উটাহ রাজ্যের মরুভূমিকে অবতরণ সফলভাবে অবতরণ করেছে। খবর বিবিসির।
নাসার বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সাত বছরের মহাকাশ যাত্রা শেষে এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা বৃহত্তম গ্রহাণুর যে নমুনা বহন করে মহাকাশযানটি ফিরছে, তা নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত তারা। কারণ, এটি আমাদের সৌরজগতের গঠন এবং কীভাবে পৃথিবী বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে সে সম্পর্কে আরও ভাল ধারণা দেবে।
নাসা জানিয়েছে, ওসিরিস-রেক্স নামের মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরছে না। সেটি মহাকাশেই থাকবে। তবে পৃথিবীতে একটি ক্যাপসুলের সাহায্যে গ্রহাণুর নমুনা পাঠিয়েছে। উত্তরপশ্চিম উটাহে একটি সামরিক পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে স্থানীয় সময় সকাল ন’টার দিকে সেই ক্যাপসুলটি অবতরণ করেছে।
এই ক্যাপসুলটি রাইফেলের বুলেটের ১৫ গুণেরও বেশি গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। একটি হিট শিল্ড এবং প্যারাস্যুটগুলো উটাহের পশ্চিম মরুভূমিতে অবতরণের আগে গতি কমিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ক্যাপসুলটিতে ২৫০ গ্রামের মতো গ্রহাণুর ধুলো রয়েছে, যার তারা বিশ্লেষষ করে দেখবেন।

যে গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে সেটির নাম হচ্ছে বেনু। এটি সৌরজগতের সবচেয়ে বিপজ্জনক শিলা হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, এই গ্রহাণুটি পৃথিবীকে প্রভাবিত করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এটি প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। অনেক গ্রহাণু পৃথিবীর কাছে আসলেও কখনও আছড়ে পড়েনি।
সৌরজগতে আট গ্রহ, সঙ্গে একাধিক উপগ্রহ। আর রয়েছে অসংখ্য গ্রহাণু। এ রকমই একটি গ্রহাণু বেনু। বয়স ৪৫০ কোটি বছরেরও বেশি। কিন্তু খোঁজ মিলেছে মাত্র কয়েক বছর আগে, ১৯৯৯ সালে। তার কাছে পৌঁছাতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু নাসার।
দু’বছর পর, ২০১৮ সালে বেনুর কাছে পৌঁছায় ওসাইরিস রেক্স। তার পর আরও দু’বছর ধরে বেণুর চারপাশে পাক খেয়েছে মহাকাশযান। কোত্থেকে নমুনা নেবে, খুঁজেছে সেই জায়গা। ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর গ্রহাণুর উত্তর গোলার্ধের একটি গহ্বরের পাথুরে মাটি ছোঁয় মহাকাশযান।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঝুরঝুরে মাটি খুঁড়ে ২৫০ গ্রাম গুপ্তধন নিয়ে বেরিয়ে আসে। সাথে সাথে বন্ধ করে দেয়া হয় ক্যাপসুলের মুখ। ২০২১ সালের মে মাসে বেনুকে বিদায় জানিয়ে, পৃথিবীর পথে রওনা দেয় ওসাইরিস রেক্স। পৃথিবীতে ফিরতে এটিকে পাড়ি দিতে হয়েছে ১৯৩ কোটি কিলোমিটার।
পৃথিবী থেকে এক লক্ষ কিলোমিটার দূরত্বে থেকে নমুনা-বোঝাই ক্যাপসুলটিকে ছেড়ে দেয় ওসাইরিস রেক্স। লক্ষ্য, আমেরিকার উটাহ মরুভূমি। পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি ধাক্কা এড়াতে ধীরে ধীরে গতি কমিয়েচে ক্যাপসুল। কাজে লাগিয়েছে সঙ্গে থাকা থ্রাস্টার বা ব্রেক। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গতি ছিলো ঘণ্টায় ৪৪ হাজার কিলোমিটার।

এর দ্রুত অবতরণ সেনাবাহিনীর সেন্সর দ্বারা নিরীক্ষণ করা হয়, পরপর দুটি প্যারাস্যুট দিয়ে গতি ধীর করা হয়। তারা সঠিকভাবে এই প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হলে, ক্যাপসুলটি ‘হার্ড ল্যান্ডিং’ অনুসরণ করার কথঅ ছিলো। তবে শেষ পর্যন্ত কিভাবে অবতরণ করানো হয়েছে সে সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
ক্যাপসুলটি সফলভাবে অবতরণ করার পর. প্রতিরক্ষামূলক মুখোশ এবং গ্লাভস পরা একটি দল দ্রুত এটিকে হেলিকপ্টার দিয়ে কাছাকাছি একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। নাসা মরুভূমির বালির সাথে নমুনার কোনো দূষণ এড়াতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এবং সাবধানতার সাথে এটি করছে নাসা।
সোমবার, নমুনাটি বিমানে করে টেক্সাসের হিউস্টনে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে পাঠানো হবে। সেখানে, বাক্সটি অন্য একটি পরিষ্কার ঘরে খোলা হবে। নাসা ১১ অক্টোবর একটি সংবাদ সম্মেলন করে তার প্রথম ফলাফল ঘোষণা করার পরিকল্পনা করেছে।
চাঁদে খনিজ সম্পদ খুঁজবে নাসা
গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনে মহাশুন্যে যাচ্ছে নাসার মহাকাশযান
ডার্টের ধাক্কায় বদলে দেয়া গেছে গ্রহাণুর গতিপথ