জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে নানামুখী আলোচনার মধ্যে দলটির সঙ্গে আবারও বৈঠক করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীর এক বাড়িতে এ বৈঠক হয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
দুই পক্ষের এই বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক (চুন্নু) ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বৈঠকে অংশ নেন। প্রায় আড়াই ঘন্টা ধরে ওই বৈঠক হয়।
বৈঠকের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে গণতান্ত্রিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির ভূমিকা রয়েছে। সারাদেশে যেভাবে নির্বাচনী উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে কীভাবে অব্যাহত রাখা যায় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন কীভাবে করা যায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই আলোচনা চলমান থাকবে। আগামীকাল ও পরশু আবার আলোচনা হতে পারে।
এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর দল দুটির নেতারা রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেও নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আলোচনার কথা বলা হয়।
সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কৌশলগত ঐক্য হতে পারে।
যদিও এই কথা উড়িয়ে দিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, তারা সাবালক হয়েছেন। নিজের শক্তিতেই নির্বাচন করবে।
আগের তিনটি নির্বাচনের মতো এবারও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন ভাগাভাগি হবে কিনা তা নিয়ে কোনে পক্ষই কিছু খোলাসা করেনি। তবে আওয়ামী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসেনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। ওই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির সেলিম ওসমান।
মঙ্গলবার এক দলীয় সভা শেষে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ নাও করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। একটি জাতীয় দৈনিক দুই মন্ত্রীর বরাত দিতে এক খবরে বলেন, ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘জাতীয় পার্টিকে বিশ্বাস নেই।’
মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির মহামচিব মুজিবুল হক চুন্নু সাংবাদিকদের বলেন, তারা সরে দাঁড়ানোর জন্য নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনিনি তিনি।
চুন্নুর এই বক্তব্যের আগে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ।
নির্বাচন বর্জন করা রওশন জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট না করতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে একত্রে মহাজোট করে জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালে ভোটে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে পরের নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনে যায় বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলো। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে জাতীয় পার্টির দ্যোদুল্যমান অবস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন রওশন।
সেই নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে প্রার্থিতা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তখন দলে রওশনকে ঘিরে তৈরি হয় একটি বলয়। তারা জানান, ভোট করবেন।
দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন। বর্তমান সংসদেও তিনি একই পদে আছেন
জি এম কাদের সে সময় তার ভাইয়ের নির্দেশ মেনে ভোট থেকে দূরে ছিলেন। তবে এরশাদের মনোনয়নপত্র ঢাকা থেকে প্রত্যাহার হলেও রংপুর-৩ ও লালমনিরহাট-১ আসনে থেকে যায়। সেই নির্বাচনে রওশন এরশাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ময়মনসিংহ-৪ আসন থেকে। ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে সেই নির্বাচনে এরশাদকে রংপুর থেকে জয়ী ঘোষণা করা হয়, পরাজিত দেখানো হয় লালমনিরহাটে।
ভোটের পর এরশাদ প্রথমে বলেন, তিনি শপথ নেবেন না। তবে তার আগেই জাতীয় পার্টির ৩৪ জন সংসদ সদস্যের বেশিরভাগের পছন্দে রওশন এরশাদ সংসদীয় দলের নেতা-নির্বাচিত হন এবং তাকে বিরোধীদলীয় নেতা করা হয়।
পরে এরশাদ শেষ সময়ে একা গিয়ে স্পিকারের কাছে শপথ নেন। তাকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়।
নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি সেবার বিরোধী দলে থাকলেও দলের কয়েকজন মন্ত্রিত্ব নেন। দলটির দ্বিমুখী ওই ভূমিকার কারণে সংসদের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা হয় অনেক।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলো অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে আবার জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দল নিয়ে হয় মহাজোট। নির্বাচনের পর জোট ভেঙে দেওয়া হলে জাতীয় পার্টি বসে বিরোধী দলে। আবারও বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন।
অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি ছয় বারের সংসদ সদস্য রওশন এরশাদ। প্রয়াত সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পত্নীর নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে জাতীয় পার্টি লাঙ্গল মনোনয়ন দিয়েছে দলের স্থানীয় এক নেতাকে। ওই আসনে নৌকা মার্কার প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগও।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করতেন। ২০১৮ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর ওই আসনে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য হন তার ছেলে সাদ এরশাদ।
আগামী ৭ জানুয়ারির ভোটেও সাদ প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় পার্টি তাকে বাদ দিয়েছে। ওই আসনে মনোনয়নে প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান ও এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের।
জাতীয় পার্টির নির্বাচন করা নিয়ে শঙ্কা আছে: কাদের
ভোটের জন্য এসেছি, চলে যাওয়ার জন্য নয়: চুন্নু
জাপার সঙ্গে জোট করবেন না, শেখ হাসিনাকে রওশন