দ্বাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর দু’দিন আগে নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে নতুন নাটকীয়তার জন্ম দিলেন দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। তবে তার এই ঘোষণাকে পাত্তা দিচ্ছে না দলের শীর্ষ নেতারা।
রোববার সকালে রওশন এরশাদ ঘোষণা দিয়ে চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে দলীয় গঠনতন্ত্রের ২০/১ ধারায় অব্যাহতি দেন। নিজেকে চেয়ারম্যান এবং কাজী মামুনুর রশিদকে মহাসচিব ঘোষণা দেন তিনি।
রোববার রওশন নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করার পর বনানী কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্রে এমন কোনো ধারাই নেই যে ধারায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক চেয়ারম্যান, মহাসচিবকে বহিষ্কার করতে পারেন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতাদের লাঙ্গলের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এরশাদের ছেলে রাহগির আলমাহি সাদ এরশাদ যে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন, সেখানে এবার ভোট করেন জিএম কাদের নিজে। শেষ পর্যন্ত রওশন বা সাদ আর নির্বাচনে যাননি।
জাতীয় পার্টিতে বহিষ্কার-পাল্টাবহিষ্কার নতুন কিছু নয়। এর আগেও রওশন দলের কাউন্সিল ঘোষণা করেছিলেন।
টানা দুই মেয়াদে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন রওশন এরশাদ। জাতীয় পার্টিতে কর্তৃত্ব নিয়ে রওশন এবং জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব চলছে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে। দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনা শাসক এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর থেকে বিবাদ আরও প্রকাশ্যে আসে।
বিএনপির বর্জন করা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে জাতীয় পার্টির দ্যোদুল্যমান অবস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন রওশন।
সেই নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে প্রার্থিতা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ। তখন দলে রওশনকে ঘিরে তৈরি হয় আরও একটি বলয়। তারা জানান, ভোট করবেন। এরপর নানা নাটকীয়তা হয় দলে।
থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদের নামে ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট দলের কাউন্সিল ডাকা হয়। এর পাল্টা হিসাবে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা রওশনকে বাদ দিয়ে কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে সেপ্টেম্বরের শুরুতে চিঠি দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে।
সেই বিরোধের মধ্যে দুজনে মিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন।
জি এম কাদেরের দলীয় চেয়ারম্যান হওয়ার বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা আছে। রওশন অনুসারী হিসেবে পরিচিত জিয়াউল হক মৃধার এই মামলার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
রোববার রওশন দলের যে গঠনতন্ত্রের ২০/১ ধরার ক্ষমতাবলে জিএম কাদের ও মহাসচিব চুন্নুকে পার্টি থেকে অব্যাহতি দেন।
জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ওই ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় পার্টিতে একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক থাকবেন। তিনি দলে সর্বোচ্চ সম্মান পাবেন। কোনো জনসভায় তিনি দলের চেয়ারম্যানের ওপরে স্থান পাবেন। চেয়ারম্যান প্রয়োজন মনে করলে প্রধান পৃষ্ঠপোষক তার পরামর্শ নেবেন। প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ক্ষমতা সম্পর্কে সেখানে কিছু বলা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য সাংবাদিকরা রওশনকে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারেননি। তবে তার ঘোষণা করা মহাসচিব মামুনুর রশিদ বলেছেন, ফেব্রুয়ারির শেষে অথবা মার্চের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সম্মেলন করার চেষ্টা করা হবে। দায়িত্ব নিয়েছি দলের সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করবো। বনানী কার্যালয় দখল করার পরিকল্পনা নেই, কাকরাইল অফিস থেকে দল পরিচালনা করা হবে।
রওশন এরশাদের এমন কর্মকাণ্ড নতুন কিছু নয় উল্লেখ করে চুন্নু বলেন, এবারই প্রথম নয়, এটা তৃতীয়বার। এর আগেও দুইবার তিনি এইরকম বাদ দিয়ে নিজেই চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। পরবর্তীতে প্রত্যাহার করেছেন উনার ঘোষণা দেওয়া ঠিক না।
তিনি বলেন, কাজেই উনার এই ঘোষণা আমি মহাসচিব হিসেবে নলেজে নিচ্ছি না। এটার কোনো ভিত্তি নাই। এটা অগঠনতান্ত্রিক, এ ধরনের কোনো ক্ষমতা উনার নাই। এই বিষয়টা আইনের ভাষায় যেটা বলে আমরা এটা আমলে নিচ্ছি না।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬ আসনে সমঝোতা করে জাতীয় পার্টি। তবে ভোটে আন পায় মাত্র ১১টি। ঢাকা থেকে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের স্ত্রী শেরীফা কাদের জামানতও জারিয়েছেন।
ভোটের পর থেকেই হেরে যাওয়া প্রার্থী এবং দলের কিছু নেতা জিএম কাদের ও মুজিবুল চুন্নুর প্রকাশ্যে বিরোধিতায় নামেন। তাদের অভিযোগ, সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়েও দলের প্রয়োজনে তা খরচ করেননি চেয়ারম্যান ও মহাসচিব।
ঢাকা উত্তরের ছয় শতাধিক নেতা-কর্মী চেয়ারম্যান ও চুন্নুর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারের অভিযোগ তুলে পদত্যাগও করেন।
ভোটের পর ‘দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের’ কারণ দেখিয়ে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে জাতীয় পার্টি।
ভোটের পাঁচ দিনের মাথায় দলের কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভরায়কে দলের সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা দুইজনই রওশন এরশাদপন্থী হিসেবে পরিচিত।
রওশন ঘনিষ্ঠ কাজী ফিরোজ রশীদ দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। আর সুনীল শুভরায় এরশাদের প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি ছিলেন।
জিএম কাদের-চুন্নুকে বহিষ্কার করলেন রওশন