তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সাংবাদিকদের তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার সম্ভাব্য বাধা দূর করতে সরকার নানা পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনায় সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে সরকারী কর্মকর্তাদের তথ্য আদান-প্রদানে নানা বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ফ্যাক্ট চেকিং ছাড়া বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রচার করায় আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে এখনো বিশ্বস্ত কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তাই এ বিষয়ে নজর দিতে সরকার নতুন পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি।
সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৪’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্টের প্রতি আমি পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্বাস করি। গণমাধ্যম যেন রাইট ইনফরমেশন অ্যাক্টকে আরও কার্যকরীভাবে ব্যবহার করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা হবে। রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্টের অধীনে কোনও গণমাধ্যম জনগণের পক্ষে যে ইনফরমেশন চাইবে, সেটা যেকোনও প্রতিষ্ঠান দ্রুত গতিতে দিতে বাধ্য থাকবে। এ ধরনের মানসিকতা তৈরি করার জন্য আমরা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অরিয়েন্টেশন করবো।
তিনি বলেন, একইসঙ্গে বলতে চাই যেগুলো সংবেদনশীল তথ্য, যেগুলো প্রাইভেসি অ্যাক্টের মধ্যে পড়ে, এগুলো যদি কেউ চুরি করে প্রকাশ করার চেষ্টা করে, সে চোর। তার কোনো পেশা আমরা দেখবো না। এই ধরনের সেনসেটিভ অ্যান্ড সিক্রেট ইনফরমেশন প্রটেকশনের আইন সবদেশে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব তথ্য দিতে হবে যেগুলো মানুষের জানার অধিকার আছে। একইসঙ্গে সংবেদনশীল তথ্য গোপন রাখবে। কাজেই একটি সিস্টেম করতে হবে যাতে সব তথ্য তারা অবহিত করতে পারে, আবার সংবেদনশীল তথ্য প্রটেকশনটাও রাখা জরুরি। আমরা এটি ঘেটে দেখছি, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো কীভাবে অপারেট করে। সাংবাদিকদের এক্সেস কতটুকু আছে? আন্তর্জাতিক যে স্ট্যান্ডার্ড আছে, তার মধ্যে আমরা সবকিছু রাখার চেষ্টা করবো।
সরকারের ব্যত্যয়-বিচ্যুতি ধরিয়ে দিতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, এ ধরনের সব সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে যখন সমালোচনার নামে অপতথ্য, মিথ্যাচার, অপপ্রচারের মাধ্যমে এক ধরনের এজেন্ডা বেইজড, সিস্টেমেটিক মিথ্যাচার ছড়ানো হয়, সেগুলো আমরা বুঝি কে করছে, কারা করছে, কেন করছে। সেই বিষয়গুলোকে আমরা নিন্দা জানাই। কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনাকে আমরা সব সময় স্বাগত জানাই এবং জানাবো। কারণ আমরা মনে করি না, সরকার যারা পরিচালনা করছেন, তারা সবাই ফেরেশতা। সবাই মানুষ। আমাদের ভুল-ত্রুটি হতে পারে, ব্যত্যয়-বিচ্যুতি থাকতে পারে, ব্যর্থতা থাকতে পারে। সেগুলো ধরিয়ে দেয়ার জন্য গণমাধ্যম আছে, এটি গণমাধ্যমের দায়িত্ব। গঠনমূলকভাবে ধরিয়ে দিলে সেটি স্বীকার করে নিতে এবং সেগুলো শুদ্ধ করে নিতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
আলোচনায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি, আজকে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে। এর জন্য প্রধানত দায়ী উন্নত বিশ্ব। এর প্রধান ভুক্তভোগী যারা হতে যাচ্ছে এর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ একটি লিডারশিপ রোল নিয়েছে ভুক্তভোগীদের পক্ষে। কাজেই এখানে আমাদের সরকারিভাবে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে, সেখানে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য যে সাংবাদিকতা সেই সাংবাদিকতাকে আমরা প্রণোদনা, উৎসাহ, সমর্থন ও সুরক্ষা দিতে চাই। এখানে কোনো বিরোধের জায়গা আমি দেখি না। তবে হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষে তৃণমূলে বিভিন্ন ধরনের ব্যত্যয় ঘটে। সেই ব্যত্যয়গুলোকে আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা তুলে ধরবেন। সরকারের অবস্থান পরিবেশ সুরক্ষার পক্ষে।
তিনি বলেন, শুধু পরিবেশ সুরক্ষা না, মুক্ত গণমাধ্যম, গণমাধ্যমের সুরক্ষা এবং মুক্ত গণমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সেই বিষয়েও আমাদের অঙ্গীকার আছে এবং থাকবে। তবে রাজনীতিতে যেমন অনেক ক্ষেত্রে অপরাজনীতি আছে, বিভিন্ন পেশায় যেমন কিছু নেতিবাচক দিক আছে, তেমন তথ্যের সাথেও আমরা অপতথ্যের বিস্মৃতি অনেক সময় দেখি। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আমরা অপসাংবাদিকতা আমরা দেখি। এটি শুধু আমি বলছি না, আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরাও বলেন। সব সাংবাদিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যেগুলোর রেজিস্ট্রেশন নেই, সেগুলো বন্ধ করে দেন।
মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, গণমাধ্যমকর্মী আইন নিয়েও বিশাল দাবি আছে। গণমাধ্যমকর্মী আইন গত সংসদে পাশ হওয়ার কথা ছিলো। শেষের দিকে এসে এটি স্ট্যান্ডিং কমিটিতে গিয়েছিলো। আমি সেই গণমাধ্যমকর্মী আইন নিয়ে নতুন করে আবার কাজ শুরু করছি। যতগুলো সাংবাদিক সংগঠন আছে সবাইকে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে, প্রতিটি সংগঠন থেকে দুইজন করে প্রতিনিধি দেয়ার জন্য। তাদের সঙ্গে বসে গণমাধ্যমকর্মী আইনটি পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন করে আমরা দ্রুততম সময়ে সংসদে পাশ করার ব্যবস্থা করবো।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক বণিকবার্তা সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদ হানিফের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাংবাদিক পিনাকী রায়।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেনআলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও সমকালের প্রকাশক সংসদ সদস্য এ কে আজাদ, সম্পাদক পরিষদের সহ-সভাপতি জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনসহ অন্যরা।
