অমর অভিযাত্রা: ফিদেল কাস্ত্রো ও সূর্যের অনন্ত আলো

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫, ১০:৪০ পিএম

বিশ শতকের ত্রিশের দশক। পৃথিবী তখন এক অস্থির, দহনময় সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকায়নি; অর্থনৈতিক মহামন্দার ছায়া পৃথিবীর বহু প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। ইউরোপে উত্থান ঘটছে ফ্যাসিবাদের; হিটলার ও মুসোলিনির পদধ্বনি যুদ্ধের আরেক মহাবিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এশিয়ায় জাপানি সাম্রাজ্যবাদ দখলযজ্ঞ চালাচ্ছে; আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা জুড়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর শোষণ-শৃঙ্খল আরও আঁটসাঁট হচ্ছে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জেও চলছে অন্যরকম লড়াই—দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতি ও মার্কিন অর্থনৈতিক দাপট যেন মানুষের শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে।

এমন এক দমবন্ধ, অস্থির পৃথিবীতে ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট জন্ম নিল এক শিশু—ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ। তাঁর জন্ম যেন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এক অদৃশ্য বিস্ময়চিহ্ন—যেন সময় নিজেই জানত, এই শিশু একদিন হবে শৃঙ্খল ভাঙার দূত।

স্বচ্ছলতার উষ্ণ কোলে জন্ম নিয়েও নিয়তি তাঁকে পাঠিয়েছিল কণ্টকময় পথে। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সেই তরুণ—যার হাতে ছিল কলম, মনে ছিল প্রশ্ন, আর চোখে ছিল অশান্ত নক্ষত্রের মতো স্বপ্ন। মনকাডা ব্যারাকে তাঁর প্রথম অভিযান কেবলমাত্র এক সশস্ত্র হামলা ছিলোনা; এটি ছিলো এক যুগের দীর্ঘ নীরবতা ভাঙার প্রথম বজ্রধ্বনি। কারাবাসের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—“ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে”—যেন শব্দগুলো ছিল সময়ের বুকে রোপিত মুক্তির বীজ, যা একদিন বিপ্লবের বনে পরিণত হবে।

এরপর এলো মেক্সিকো—ভাগ্যের সেই মিলনক্ষেত্র, যেখানে ইতিহাসের স্রোত এসে মিললো মানুষের সংকল্পে। চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ছিলো দুই আগ্নেয়গিরির লাভা মিলিয়ে তৈরি হওয়া নতুন মহাশক্তি। ছোট্ট ‘গ্রানমা’ নৌকায় ৮২ জন যোদ্ধা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কিউবার তটে পা রাখলেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড়ি অরণ্যে চলল লড়াই। এই লড়াই গোলাগুলির তীব্রতায় যেমন, তেমনি মানুষের হৃদয় জয় করার ক্ষমতায়ও। অবশেষে ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে হাভানার আকাশে উড়ল বিপ্লবের পতাকা, আর লাতিন আমেরিকার আকাশ পেল নতুন ভোরের রঙ।

ক্ষমতায় এসে ফিদেলের প্রথম অঙ্গীকার—জনগণের সম্পদ জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। তাঁর বিশ্বাস ছিল—“একজন ডাক্তার তৈরি করা একটি ট্যাঙ্ক তৈরির চেয়ে বেশি মূল্যবান।” শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হয়ে উঠল নতুন কিউবার হৃদস্পন্দন। ফলাফল—প্রায় শতভাগ সাক্ষরতার হার, শিশুমৃত্যুর হার উন্নত দেশের সমান, আর সবার জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা।

তার পথ শান্ত সমুদ্রের নৌযাত্রা ছিলো না। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা—৬০০ বারেরও বেশি। তবু তাঁর অঙ্গীকার ভাঙেনি। তাঁর কণ্ঠে শোনা গেছে শপথ—“আমরা সমাজতন্ত্র রক্ষা করব, মৃত্যু পর্যন্ত!”—যা হয়ে উঠেছিল এক জাতির সম্মিলিত সাহসের প্রতিধ্বনি।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েও ফিদেল বিকল্প দিগন্ত খুঁজে নিলেন—পর্যটন, জৈবপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব কৃষি। প্রতিটি সংকটকে তিনি পরিণত করলেন সম্ভাবনার প্রভাতে।

তাঁর এই আলো কেবল কিউবার জন্যই ছিল না। ১৯৭১ সালে এশিয়ার এক ছোট্ট কিন্তু সংগ্রামী ভূখণ্ড—বাংলা—যখন মুক্তির লড়াইয়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, ফিদেল কাস্ত্রো সেই সংগ্রামের পাশে দাঁড়ালেন নির্দ্বিধায়। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ সফরে তিনি যে উষ্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন, তা শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না—এটি ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রতি এক বিপ্লবীর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, যা আজও আমাদের কৃতজ্ঞতার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে।

ফিদেলের বক্তৃতা ছিল ইতিহাস, দর্শন আর কবিতার এক অনন্য মিশ্রণ; তাঁর লেখা Guerrilla Warfare নিপীড়িত মানুষের জন্য যেন এক মুক্তির নকশা।

২০১৬ সালে তিনি শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও, তাঁর চিন্তা, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর সংগ্রামের আগুন এখনও নিভে যায়নি।

আজ তার জন্মদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় —বিপ্লব মানে কেবল পতাকা বদল নয়; বিপ্লব মানে মায়ের নিশ্চিন্ত হাসি, কৃষকের আত্মমর্যাদা, শ্রমিকের সোজা হয়ে হাঁটার সাহস। ফিদেল কাস্ত্রো তাই কেবল ইতিহাসের চরিত্র নন—তিনি আছেন প্রতিটি ন্যায়ের স্বপ্নে, প্রতিটি অবিচল হৃদয়ে। সূর্য অস্ত গেলেও যেমন তার আলো থেকে যায়, তেমনি তাঁর আলোও ছড়িয়ে আছে—আগামী দিনের প্রতিটি ভোরে, প্রতিটি মুক্তির স্বপ্নে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্টার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

একাত্তর/এসি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি।
ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করে তুলতে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সৌদি আরবে সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নারী ও পুরুষের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত...
দেশে হাম ও হামের উপসর্গের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরজুড়ে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর