রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা টালমাটাল। মূলধন ঘাটতি, লাগামহীন খেলাপি ঋণ, দুর্বল আদায়ক্ষমতা ও মুনাফাহীনতার কারণে ব্যাংকগুলো কার্যত সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সমাধানে আগের কর্মপরিকল্পনাকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন করে বাস্তবমুখী ও নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা দিতে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালি, কৃষি ও রাকাব- এই ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১৯ সালে যেখানে ঘাটতি ছিল মাত্র ৩১ হাজার কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে জনতা ব্যাংক, যাদের মূলধন ঘাটতি একাই ৬৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এই বিপুল অঙ্কের বড়ো অংশই আটকে আছে বেক্সিমকো, এস আলম, অ্যাননটেক্সসহ শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে।
ছয় ব্যাংক মিলিয়ে ৩২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি ডেফারেল সুবিধা নিয়ে সাময়িকভাবে আড়াল করা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ না রেখেই তারা ঝুঁকির বড়ো অংশ ঠেলে দিয়েছে ভবিষ্যতের দিকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান একাত্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অর্থ বের করে নিয়েছে অল্প কিছু ব্যবসায়ী। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। এর জন্য সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ইতোপূর্বেও এসব ব্যাংকে মূলধন যোগান দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত যে নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে এই মুহূর্তে সরকারের মূলধন প্রদান করার সক্ষমতা নেই। এছাড়া এসব ব্যাংকে নতুন করে মূলধন দেয়ার নীতি থেকেও বেরিয়ে এসেছে সরকার। তাই ব্যাংক কর্মকর্তারাই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদেরকে কিভাবে ভালো করতে হয় সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা পাঠাতে বলা হয়েছে। তবে তাদের টেনে তোলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে নেওয়া কঠিন। ঋণ বিতরণের পর যত ভালো গ্রাহকই হোক ঐ ঋণ তদারকি করা ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে কাজ যথাযথভাবে পালন করেনি।
জুন পর্যন্ত ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট খেলাপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক, যেখানে প্রতি ১০০ টাকার ঋণের ৭১ টাকা ঝুঁকিপূর্ণ। ছয় ব্যাংকের গড় খেলাপি হার প্রায় ৪৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক হিসাব বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি আরও বেশি- ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা- যার বিপরীতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি। কিন্তু এর অর্ধেকও আদায় করতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
সোনালী, রূপালি, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ জুন পর্যন্ত ছিল ১৪ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এই ঋণ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৩১৫ কোটি, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ১০৪ কোটি টাকা।
একই সময়ে ছয় ব্যাংক সুদ থেকে আয় করেছে ১৫ হাজার ১০৯ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৩৮৮ কোটি। অর্থাৎ সুদখাতেই ব্যাংকগুলোতে ঘাটতির প্রবণতা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থে গড়ে ওঠা ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
জানতে চাইলে এসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল আমিন একাত্তরকে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এমডি ডিএমডি নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ব্যাংকগুলোতে দুই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এজন্য তাদের মধ্যে সরকারি একটা ভাব রয়েছে। তাদের বেতনবিধিও সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানের মত। এজন্য গতানুগতিকভাবে সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা যেভাবে চলেন তাদের মধ্যেও ওই ধরনের মন-মানসিকতা কাজ করে।
তথ্য বলছে, এসব ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ দেওয়া হয়েছে মাত্র পাঁচটি শাখা থেকে, এবং সেই ঋণের ৮০ শতাংশই এখন খেলাপি।
এছাড়া ব্যাংকগুলোর মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত ১২৬ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
পুরোনো কর্মপরিকল্পনাকে অকার্যকর উল্লেখ করে নতুন করে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিতে ছয় ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
