মার্কিন মিত্র হয়েও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি মধ্যপ্রাচ্য

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমেরিকা যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নিয়েছে, তার ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন চালায়নি, তবুও দেশটির শীর্ষ নেতা এবং জেনারেলদের শারীরিকভাবে নির্মূল করা হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের ওপর কোনো সামরিক হামলার পরিকল্পনাও করছিল না; ফলে তেল আবিব বা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ চালানোর কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সমৃদ্ধিকরণ, মজুত, আইএইএ পরিদর্শন এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বিষয়ে আমেরিকার সব দাবি মেনে নিয়েছে। তার মতে, ২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে হওয়া চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল ইরান। স্বয়ং আইএইএ প্রধান এই আলোচনায় যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী দফার প্রযুক্তিগত আলোচনা জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সেই আলোচনার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়ে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। আলোচনার মাঝপথে ইরানে হামলা চালানোর ঘটনা ট্রাম্পের জন্য এটি দ্বিতীয়বার। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে আলোচনার টেবিলে বসা অবস্থাতেই ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।


ইরানের ছাড় এবং আমেরিকার দ্বিমুখী নীতি

ইরানের পারমাণবিক ইস্যুটিকে নিরপেক্ষভাবে দেখা প্রয়োজন। ইরান পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি বা এনপিটি-তে সই করা দেশ হিসেবে শান্তিপূর্ণ প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার রাখে। ইরান এই অধিকার ছাড়তে চায়নি, তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় তারা সমৃদ্ধকরণের সীমারেখার বিষয়ে নজিরবিহীন ছাড় দিয়েছিল।

অথচ বাস্তবতা হলো, ইসরাইলের পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার বিষয়টি একটি ‘খোলা রহস্য’ হলেও আমেরিকা তা সব সময় উপেক্ষা করে। উত্তর কোরিয়া এনপিটি ত্যাগ করে পারমাণবিক অস্ত্র বানালেও আমেরিকা তার সাথে আপস করে নিয়েছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া কিংবা পাকিস্তান ও চীনের পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়েও ওয়াশিংটন কখনও কড়া অবস্থান নেয়নি।

এমনকি রাশিয়ার সাথে হওয়া নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিগুলো থেকেও আমেরিকা বেরিয়ে গেছে এবং পুনরায় পারমাণবিক পরীক্ষার ঘোষণা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, কঠোর আইএইএ তত্ত্বাবধানে থাকা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আমেরিকার এই মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তাড়িত। ট্রাম্প ২০২৫ সালের জুনে ঘোষণা করেছিলেন যে, ১২ দিনের যুদ্ধে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দিয়েছেন। যদি তাই হয়, তবে এখন সেই একই ইস্যুকে যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার অর্থ কী?


পারমাণবিক অস্ত্র আসলে কোথায়
?

ইরান আর মাত্র কয়েক মাস বা কয়েক সপ্তাহ পরেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে যাচ্ছে, এমন একটি বয়ান ইসরাইল ও আমেরিকা দীর্ঘকাল ধরে প্রচার করে আসছে। অথচ বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও ইরান পারমাণবিক বোমা বানায়নি। ইরানের গোপন স্থাপনায় পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর অভিযোগগুলোও কখনও প্রমাণিত হয়নি।

নিঃসন্দেহে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়েছে, তবে তা সম্ভবত আলোচনার টেবিলে দর কষাকষির একটি কৌশল হিসেবে। ট্রাম্প যখন প্রথম মেয়াদে জেসিপিওএ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান, তখন সম্ভবত নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে বাঁচতে সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল তেহরান।


একটি দেশ কি নিজেকে রক্ষা করবে না
?

ওবামা আমলেও ইরানের মিসাইল সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ভূমিকার ওপর বিধিনিষেধের দাবি তোলা হয়েছিল, যা ইরান প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে জেসিপিওএ চুক্তিটি শুধু পারমাণবিক ইস্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনায় ট্রাম্প সেই পুরনো দাবিগুলো আবার সামনে আনেন।

এর মূল কারণ ছিল ১২ দিনের যুদ্ধে দেখা যাওয়া ইরানের বিধ্বংসী মিসাইল সক্ষমতা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতি তাদের সমর্থন। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, এনপিটি-র মতো এমন কোনো আন্তর্জাতিক আইন নেই যা কোনো দেশকে মিসাইল রাখতে বাধা দেয়। তাই ইরান তার আত্মরক্ষার প্রধান শক্তিটি বিসর্জন দেবে, এমন আশা করা ছিল অবাস্তব।


অধিকার ও অন্যায়ের ঊর্ধ্বে

ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা যদি আমেরিকার জন্য সমস্যা হয়, তবে ইরানও আমেরিকা ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক ভূমিকাকে (বিশেষ করে ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদ) সমস্যা হিসেবে দেখতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কে ঠিক আর কে ভুল তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ইরান একটি কৌশলগত ভুল করেছে, তারা নিজেকে ইসরাইলের প্রধান প্রতিপক্ষ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রধান সমর্থক হিসেবে এমনভাবে জাহির করেছে যা আরব দেশগুলোর চেয়েও কয়েক ধাপ এগিয়ে।

আরব দেশগুলো বরং ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্য বা গোপনে সুসম্পর্ক রাখছে। ফলে ইসরাইল ও আমেরিকা ইরানকেই তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতার পথে প্রধান বাধা হিসেবে মনে করে।


উপসাগরীয় দেশগুলোর মোহভঙ্গ
?

সরাসরি সেনা মোতায়েন না করে এবং একটি দুর্বল ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ করার ট্রাম্পের এই কৌশল প্রশ্নবিদ্ধ। এর আগে ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ায় আমেরিকার এই নীতি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প কেন মনে করছেন যে ইরানকে অস্থিতিশীল করার পরিণতি সামলানো সহজ হবে, তা পরিষ্কার নয়।

ইরান বারবার সতর্ক করেছিল, আক্রান্ত হলে তারা এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন বা সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলা আজ তাই আশ্চর্যের বিষয় নয়। তবে এই দেশগুলো এখন স্তম্ভিত। তারা ভেবেছিল মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাদের সুরক্ষা দেবে, কিন্তু এখন দেখছে যে আমেরিকার উপস্থিতি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

তারা কি এটা আগে বোঝেনি?

সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বাসই করতে পারেনি যে ইরান তাদের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা চালাবে। তারা ভেবেছিল ইরানের প্রতিশোধ কেবল ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে। ইরানের সাথে আরব আমিরাতের বড় ব্যবসা রয়েছে, সৌদি আরবের সাথেও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোড়া লেগেছিল। কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমে ইরান যে অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানবে, ড্রোন দিয়ে বিমানবন্দর অচল করে দেবে এবং পর্যটন ও ব্যবসায় ধস নামিয়ে দেবে, তা তারা কল্পনাও করেনি।


বাজি রাখা হয়েছে অনেক কিছু

ইরানের এই হামলার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। উপসাগরীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে নিজেদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় এবং তেলের বাণিজ্য ব্যাহত হয়, তবে ভারতের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য তা হবে এক ভয়াবহ আঘাত। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী, রেমিট্যান্স এবং তেল-গ্যাসের আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য চরম উদ্বেগজনক। আমাদের জন্য এখন এই উত্তেজনা প্রশমন অত্যন্ত জরুরি।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ নমনীয়। আমরা এই হামলার নিন্দা জানাইনি, যা অনেকটা ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার প্রতি আমাদের অবস্থানের মতোই। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি উঠলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের কূটনীতি এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।

 (লেখক কানওয়াল সিবাল তুরস্ক, মিশর, ফ্রান্স এবং রাশিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত এবং ওয়াশিংটনে ডেপুটি চিফ অফ মিশন ছিলেন।)

এআরএস
চীন বর্তমানে একই সাথে দুটি যুদ্ধকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রথমটি হলো ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাত ‘অপারেশন সিন্দুর’, যেখান থেকে তারা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পাকিস্তানের...
পাশ্চাত্যের ক্ষমতার অলিন্দে বর্তমানে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমেরিকার ঘনিষ্ঠতম মিত্ররা এখন আর বন্ধ দরজার আড়ালে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে না; বরং তারা সংসদীয় মঞ্চ এবং সংবাদ সম্মেলনে...
স্বৈরাচারী রাজনীতি এবং সামরিক আগ্রাসনের মিশ্রণ সবসময়ই বিপজ্জনক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে খুব ভোরে মার-এ-লাগোতে বসে বেসবল ক্যাপ পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন, সেই সত্যটিই...
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও কারাবন্দী আওয়ামী লীগ নেতা ডা. সেলিনা হায়াত আইভী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা আট মিনিটে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্ত হন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও গাইবান্ধায় আলাদা বজ্রপাতের ঘটনায় মা-ছেলে ও এক কিশোরসহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বুধবার (৩ জুন) বিকেলে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলা দুটিতে আলাদা বজ্রপাতে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
নারায়ণগঞ্জের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার বিরুদ্ধে মানুষের চলাচলের সরকারি রাস্তা টিনের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদ করায় বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে তার...
বরগুনা জেলা পরিষদের সদর ডাকবাংলোর তিনতলার দুটি কক্ষ থেকে এক নারী ও তার দুই শিশু কন্যার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (৩ জুন) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ এসে কক্ষের দরজা ভেঙে মরদেহগুলো...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর