বৃহস্পতিবার রাতে পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপের। কিন্তু মাঠের বল গড়ানোর ঠিক আগের দিন, বুধবার বিশ্ব ফুটবলে এক বিশাল পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালেন ডাচ ফুটবল কিংবদন্তি রুদ গুলিত।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত ও কট্টর অভিবাসন নীতির কারণে বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসা বিভিন্ন দেশের ফুটবলার, রেফারি এবং অফিশিয়ালদের ওপর আমেরিকার চরম হেনস্তা ও ভিসা কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন তিনি।

এক খোলা চিঠিতে গুলিত সোজা জানিয়েছেন, ফুটবলকে কলঙ্কিত করা এবং টুর্নামেন্টের মর্যাদা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া ইনফান্তিনোর আর এই পদে থাকার কোনো যোগ্যতা নেই।
চীনা সংবাদ সংস্থা- সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যৌথ আয়োজক দেশ আমেরিকায় পা রেখে একের পর এক দেশ যেভাবে অপদস্থ হয়েছে, তা নজিরবিহীন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ইরান দলকে তাদের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নিতে হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে ইরানি সমর্থকদের টিকিট।

আফ্রিকার বর্ষসেরা সোমালি রেফারি ওমর আরতানকে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে তাড়িয়েছে মার্কিন ইমিগ্রেশন। ইরাকি গোলমেশিন আয়মান হুসাইনকে শিকাগো বিমানবন্দরে ৭ ঘণ্টা আটকে রেখে জেরা করা হয়েছে এবং তাঁদের অফিশিয়াল ফটোগ্রাফারকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়; সেনেগাল এবং উজবেকিস্তান ফুটবল দল আমেরিকায় পৌঁছানো মাত্রই অপরাধীদের মতো তাঁদের পুরো শরীর ও মালামাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তল্লাশি করা হয়েছে। মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলোর সাংবাদিক ও ভক্তরা আদৌ খেলা দেখতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের হয়ে ৬৬টি ম্যাচ খেলা এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃত রুদ গুলিত তাঁর চিঠিতে ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, আমি দীর্ঘদিন চুপ ছিলাম, কারণ আমি এই বিশ্বকাপকে শুধু ফুটবলের চোখেই দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ফুটবল এখন আর মূল আলোচনায় নেই। এই কারণে আমি মনে করি, জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উচিত অবিলম্বে ফিফা প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা।
গুলিত আরও যোগ করেন, বিশ্বকাপের কাজ হলো মানুষকে একত্রিত করা। অথচ এই টুর্নামেন্টটি এখন বিভাজন, রাজনৈতিক কোন্দল, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক নোংরা প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফিফা কোন মুখে ফুটবলকে একটি সার্বজনীন খেলা বলে দাবি করে, যেখানে যোগ্য সমর্থক, অফিশিয়াল এবং প্রতিযোগীরা ফুটবল বহির্ভূত কারণে দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছেন? ফিফার প্রথম দায়িত্ব ছিল এই প্রতিযোগিতার সততা ও সবার জন্য প্রবেশাধিকার রক্ষা করা, যা তারা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

ইনফান্তিনোর চামড়া জ্বালিয়ে দিয়ে গুলিত তাঁর চিঠিতে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, নেতৃত্ব মানে বিশ্বনেতাদের সাথে ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়া বা কেবল বাণিজ্যিক সাফল্য উদযাপন করা নয়। নেতৃত্ব মানে হলো যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে, তখন বুক চিতিয়ে নিজের কাঁধে দায়িত্ব নেয়া। ইনফান্তিনো সাহেবের এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, তিনি বিশ্ব ফুটবল পরিচালনা করার জন্য আদেও সঠিক ব্যক্তি কিনা।
ডাচ কিংবদন্তি বেশ চটকদার ভঙ্গিতে মনে করিয়ে দেন, বিশ্বকাপটা কোনো সরকার, রাজনৈতিক স্বার্থ বা এসি রুমে বসে থাকা ফুটবল প্রশাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি খেলোয়াড়, রেফারি আর কোটি কোটি সমর্থকদের। বর্তমান ফিফা প্রশাসনের অধীনে যদি ফুটবলারদের ন্যূনতম সম্মান রক্ষা না হয়, তবে ফুটবলের স্বার্থেই এবার ফিফায় নতুন নেতৃত্ব আসা জরুরি। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই গুলিতের এই বিস্ফোরক চিঠি যে ইনফান্তিনোর ওপর হিমালয়সম চাপ তৈরি করল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
