বিশ্বকাপের নকআউটের প্রথম পর্ব ভোর ৫টায় মাঠে নামছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই পর্তুগাল শিবিরে বইছে তুমুল সমালোচনার ঝড়। উজবেকিস্তান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের মাত্র একটিতে জিতে কোনো রকমে নকআউটে পা দেওয়ায় দেশের সংবাদমাধ্যম ও পণ্ডিতদের ধোলাইয়ের মুখে পড়েছেন কোচ রবার্তো মার্তিনেস।
একঝাঁক বিশ্বসেরা তারকা থাকা সত্ত্বেও দলের এমন ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সে কোচের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ছাড়ছেন না সমর্থকরাও। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে দলের অন্যতম কাণ্ডারি বের্নার্দো সিলভা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দলের ভেতর স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।

ম্যানচেস্টার সিটি ছেড়ে আগামী মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিতে যাওয়া বের্নার্দো সিলভা নিজেই এখন দলের মূল একাদশে জায়গা হারিয়ে সাইড বেঞ্চের শোভা বাড়াচ্ছেন। তবে দলের এই কঠিন সময়ে কোচের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে বেশ পরিণত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
নিজের ডিমোশন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সিলভা বলেন, আমি প্রশ্নটা বুঝতে পারছি, তবে এই মুহূর্তে এটি খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়। আমরা এখানে একটা দল হিসেবে একই স্বপ্ন নিয়ে এসেছি। ডাগআউটে বসে ৫ মিনিট খেলি আর ড্রেসিংরুমেই থাকি, দলের প্রয়োজনে আমি যেকোনো ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। গণমাধ্যমের সমালোচনা ফুটবলেরই অংশ, তবে আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে মাঠ ও মাঠের বাইরে খেলাটার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে হবে।
মার্তিনেসের দলে মাঝমাঠের এত ছড়াছড়ি যে, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও সিলভাকে হয়তো বেঞ্চেই কাটাতে হতে পারে। অন্যদিকে কলম্বিয়ার বিপক্ষে সাইডলাইনে থাকা পিএসজি তারকা জোয়াও নেভেসের আজ শুরুর একাদশে ফেরার সম্ভাবনা প্রবল।

বিপরীতে পর্তুগালের মতো এত তারকার মেলা নেই ক্রোয়েশিয়া শিবিরে। তবে গ্রুপ ‘এল’-এ ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও ঘানা ও পানামাকে হারিয়ে তারা দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে। ২০১৮ সালের রানার্সআপ এবং ২০২২ সালের সেমিফাইনালিস্ট ক্রোয়াটদের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ রেকর্ড যেকোনো দলের জন্যই ঈর্ষণীয়। তবে লুকা মদ্রিচের বয়স এখন ৪০ ছুঁইছুঁই, ফলে এই বুড়ো দলটির স্বর্ণযুগ যে শেষের দিকে, তা বলাই বাহুল্য। ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ডিফেন্ডারের কৌশল বাদ দিয়ে আজ পর্তুগিজদের আটকাতে চার ডিফেন্ডারের চেনা ছকেই ভরসা রাখছেন।
পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, শেষ ৫টি বিশ্বকাপের মধ্যে চারবারই গ্রুপ পর্বে অন্তত দুটি ম্যাচ জিততে ব্যর্থ হওয়ার পরও নকআউটে ওঠার এক অদ্ভুত রেকর্ড ধরে রেখেছে পর্তুগাল। তবে কলম্বিয়ার বিপক্ষে তাদের বল পজেশন ছিল মাত্র ৪৫ শতাংশ, যা গত এক বছরের মধ্যে তাদের সর্বনিম্ন। সেই ম্যাচে অবশ্য একটি অনন্য কীর্তি গড়েছেন ভিতিনহা; পর্তুগিজ হিসেবে বিশ্বকাপে অন্তত ২০টি পাস দিয়ে শতভাগ সফল পাস (৫৪টির মধ্যে ৫৪টি) দেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
এছাড়া ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ভোরে মাঠে নামলেই জার্মানির লোথার ম্যাথাউসের (২৮ ম্যাচ) পর যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ডে ভাগ বসাবেন। তবে আল-নাসর তারকার জন্য একটি লজ্জার রেকর্ডও অপেক্ষা করছে, গত দুটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি সর্বোচ্চ ১১ বার অফসাইডের ফাঁদে পড়েছেন, যা এমবাপ্পের চেয়েও ৪টি বেশি!

ক্রোয়েশিয়ার ট্রাম্প কার্ড অবশ্যই বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখানো লুকা মদ্রিচ। ঘানার বিপক্ষে অ্যাসিস্ট করে ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক (৪০ বছর ২৯১ দিন) অ্যাসিস্ট দাতা হয়েছেন তিনি। এছাড়া ক্রোয়াটদের ইভান পেরিসিচ তার ২০টি বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রতিটিতেই শুরুর একাদশে খেলে অনন্য এক আভিজাত্য বজায় রেখেছেন।
ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণা, ক্ষিপ্রতা হারানো এই বুড়ো ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের সামনে এটি নিজেদের জাত চেনানোর সুবর্ণ সুযোগ। মাঝমাঠ আর আক্রমণের ধার বিবেচনায় পর্তুগাল অনায়াসেই ৩-০ ব্যবধানে ক্রোয়েশিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কাটবে বলেই ধরা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, রোনালদো-সিলভারা মাঠের খেলায় নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে এনে দেশের সমালোচকদের মুখে চুনকালি দিতে পারেন কি না!
