আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে মহাজাগতিক সেমিফাইনালে নামার আগে ট্রফি খরা কাটানোর স্বপ্নে বিভোর থ্রি-লায়ন্স সমর্থকেরা। নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে পিষে দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে পা রেখেছে হ্যারি কেনের দল। সব মিলিয়ে বড় টুর্নামেন্টের মঞ্চে এটি ইংল্যান্ডের সপ্তম সেমিফাইনাল (১৯৬৮ সালের চার দলের ইউরো বাদ দিয়ে)।
ফুটবল ইতিহাস বলছে, সেমির মহারণ ইংলিশদের জন্য সবসময়ই এক পরম আনন্দ আর তীব্র রক্তক্ষরণের ট্র্যাজিক মঞ্চ। আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যে দেখে নেয়া যাক অতীতে সেমিফাইনালের অগ্নিপরীক্ষায় কেমন ফেরেস্তা বা দানবের মুখোমুখি হয়েছিল ব্রিটিশরা:

ইংল্যান্ড ২-১ পর্তুগাল (১৯৬৬ বিশ্বকাপ): সেবার পর্তুগাল দল শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে ওয়েম্বলিতে এসেছিল, যার মূলে ছিলেন টুর্নামেন্টে ১৪ গোলের মধ্যে ৭টি একাই করা কিংবদন্তি ইউসেবিও। কিন্তু ববি চার্লটন ম্যাচের দুই অর্ধে দুটি বুলেট শটে পর্তুগিজদের স্তব্ধ করে দেন। শেষ মুহূর্তে ইউসেবিও পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও তা সান্ত্বনা ছাড়া কিছুই ছিল না। এরপরের ইতিহাস তো সবার জানা, সেবারই প্রথম ও শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ঘরে তুলেছিল ইংল্যান্ড।

পশ্চিম জার্মানি ১-১ ইংল্যান্ড (১৯৯০ বিশ্বকাপ): ১৯৬৬ সালের ফাইনালের ২৪ বছর পর এটিই ছিল ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ম্যাচ। আর এই ম্যাচটিই ইংলিশ ফুটবলে চিরকালের জন্য লেপ্টে দিল পেনাল্টি শুটআউটের এক অভিশপ্ত জুজু। আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের ডিফ্লেক্টেড গোলে জার্মানি এগিয়ে যাওয়ার পর গ্যারি লিনেকার গোল করে সমতা ফেরান। কিন্তু টাইব্রেকারে স্টুয়ার্ট পিয়ার্সের শট সেভ হয় আর ক্রিস ওয়াডল বল আকাশে ভাসিয়ে দিলে আল্পস পর্বতের পাদদেশে কান্নার রোল ওঠে। পল গ্যাসকোইনের সেই বিখ্যাত চোখের জল আজও ইংলিশ ফ্যানদের বুকে জখম হয়ে আছে।

জার্মানি ১-১ ইংল্যান্ড (১৯৯৬ ইউরো): ছয় বছর পর ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে আবারও সেই একই প্রতিপক্ষ, একই নাটক আর একই বিষাদময় পরিণতি। অ্যালান শিয়ারারের হেডে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেলেও স্তেফান কুন্টজ দ্রুত জার্মানিকে সমতায় ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে গ্যাসকোয়েন স্লাইড করে গোল করার একদম কাছাকাছি পৌঁছেও ব্যর্থ হন। টাইব্রেকারে প্রথম ১০টি পেনাল্টিতেই দুই দল গোল করার পর সাউথগেটের নেয়া দুর্বল শটটি জার্মানির গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেন। সেই শুরু ব্রিটিশদের ‘৩০ বছরের হাহাকার’।

ক্রোয়েশিয়া ২-১ ইংল্যান্ড (২০১৮ বিশ্বকাপ): ছয় বছর আগের সেই পেনাল্টি মিস করা গ্যারেথ সাউথগেট এবার কোচের ড্রেসিংরুমে। ৫৩ বছর পর ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছিল কাইরান ট্রিপিয়ারের জাদুকরী ফ্রি-কিকের শুরুর গোলটি। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধে লিড ধরে রাখলেও দ্বিতীয়ার্ধে পেরিসিকের গোল এবং অতিরিক্ত সময়ে মারিও মান্দজুকিচের সেই বুলেট শটে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ইংলিশদের হৃদয়।

ইংল্যান্ড ২-১ ডেনমার্ক (২০২০ ইউরো): মিক্কেল ডামসগার্ডের ফ্রিকিক যখন ইংল্যান্ডের জালে জড়াল, ওয়েম্বলিতে তখন চেনা ভূত তাড়া করতে শুরু করেছিল ফ্যানদের। কিন্তু ডেনমার্কের সিমোন কেয়ারের আত্মঘাতী গোলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। এবার আর পেনাল্টি শুটআউটের স্নায়ুচাপ নিতে হয়নি; হ্যারি কেনের পেনাল্টি শট ডেনিশ কিপার ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি শটে বল জালে জড়িয়ে সেমিফাইনালের ভূত তাড়ান কেন। যদিও ফাইনালে ইতালির কাছে সেই পেনাল্টিতেই হারতে হয়েছিল তাদের।

ইংল্যান্ড ২-১ নেদারল্যান্ডস (২০২৪ ইউরো): জাভি সিমন্সের জাদুকরী গোলের পর হ্যারি কেনের পেনাল্টিতে সমতায় ফেরে ম্যাচ। যখন সবাই ধরে নিয়েছে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বদলি খেলোয়াড় কোল পামার ও অলি ওয়াটকিন্সের যুগলবন্দীতে ম্যাচের একদম শেষ মিনিটে বাজিমাত করে ইংল্যান্ড। সাউথগেট তাঁর কোচিং কেরিয়ারের দ্বিতীয় ফাইনালে উঠলেও স্পেনের কাছে হেরে ট্রফি অধরাই থেকে যায়।
সেমিফাইনালের এই রক্তক্ষয়ী ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস পিঠে নিয়ে বুধবার আটলান্টার মাটিতে নামছে থ্রি-লায়ন্স। অতীতে সাতবারের মধ্যে মাত্র তিনবার সেমিফাইনালের বৈতরণী পার হতে পেরেছে তারা। এবার সামনে বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দল এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার ভূত কাঁধে নিয়ে আসা আর্জেন্টিনা। হ্যারি কেনের ইংল্যান্ড কি পারবে অতীত অভিশাপের সব শেকল ভেঙে ফাইনালে ওঠার নতুন রূপকথা লিখতে, নাকি লাতিন আমেরিকানদের সাম্বার তালে আরও একবার ট্র্যাজিক নায়ক হয়েই বিদায় নেবে থ্রি-লায়ন্স? উত্তর মিলবে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই!
