দেশে উৎপাদন বাড়ালে দুর্ভিক্ষ ঠেকানো সম্ভব।করোনা পরিস্থিতিতেই মঙ্গা বা দুর্ভিক্ষ হয়নি এবারও হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাবার মতোই কৃষকদরদী। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের কৃষকদের এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রণোদনা দিচ্ছেন। আর বিএনপি আমলে সার বিদ্যুতের জন্য বিদ্রোহ করে খুন হয়েছিলেন কৃষকেরা। একাত্তরের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তবে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী কমিটি প্রেসিডিয়াম-এর মেম্বার এই নেতা স্বীকার করেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যয্যমূল্য নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। আর কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দেয়া সরকারি সুবিধাও সাধারণ কৃষকরা পাচ্ছে না, পাচ্ছে ধনী ও শিল্পপতিরা। জুলিয়া আলম এর সাথে তার দীর্ঘ আলাপচারিতায় আরো অনেক বিষয়েই কথা বলেছেন এই মন্ত্রী।
জুলিয়া: চারদিকে শঙ্কা আর আপনাদের সরকারই সতর্ক করছে যে বিশ্বমন্দা আসছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষিমন্ত্রী হিসেবে আপনি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে জাতিকে কি আশ্বাস দিতে পারেন?
ড. রাজ্জাক: দেখুন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা প্রকৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখছি, এবছর দেখেন খরা হচ্ছে। এমনকি শীতপ্রধান ইউরোপের দেশগুলোতেও জমি খরার কারণে ফেটে গেছে, পুড়ে গেছে। ইংল্যান্ডের মতো দেশে তাপমাত্রা এবার ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে যেটা আগে কোনোদিনও হয়নি। এতে খাদ্য উৎপাদন কমেছে। এই কারণেই আর্ন্তজার্তিক বাজারে গম চালসহ সব খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বারবার সর্তক করছেন যেন এক ইঞ্চি জায়গাও অনাবাদি না থাকে। তিনি এটিও বলেছেন আমরা যেন উচ্চফলনশীল বীজ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করি। আমরা যেন বিদেশের খাদ্যের উপর নির্ভর না করি। যদি আমাদের উৎপাদন কম হয় তাহলে বাহির থেকে আমদানি করতেই হবে। আমাদের খাদ্য দিয়ে যতটা সম্ভব চাহিদা মেটাই। আমাদের খাদ্য যদি আমরা ধরে রাখতে পারি আর কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি না হয় তাহলে কোন দুর্ভিক্ষ হবে না। আমরা সর্বতভাবে চেষ্টা করবো যেন কোন দুর্ভিক্ষ না হয়।
জুলিয়া: বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। খাদ্য উৎপাদনেও আমরা নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ দাবী করে আসছি কয়েক দশক ধরে। তাহলে দেশের বাইরের সংকটের কারণে আমরা কেনো দুর্ভিক্ষে পড়বো?
ড. রাজ্জাক: এভাবে বললেতো হবে না। আসলে তেল জাতীয় শস্য এবং গম আমরা আমদানি করি। আমাদের ইয়াং জেনারেশন ফাস্ট ফুড খায় তাই তেল গমের চাহিদা বেড়েছে। বছরে ৫০-৬০ টনের মতো গম আমদানি করতে হয়। তেল অনেক আমদানি করতে হয়, তেলবীজও আমাদের আমদানি করতে হয়। ডাল ও দুধ আমদানি করতে হয়। টাকার অঙ্কে আমদানি অনেক। আমাদের ভোজ্যতেল আমদানিতেই ২০ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হয়। আমরা কর্মসূচি নিয়েছি আগামী ৩ বছরের মধ্যে তেলবীজের উৎপাদন বাড়াবো আর আমদানি ৫০% কমিয়ে আনবো। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ চালে আর কিছু পণ্যে। গমসহ অনেক কিছু আমদানি করতেই হবে। ৩ কোটি ৯০ লক্ষ্য বা প্রায় ৪ কোটি টন চাল আমরা উৎপাদন করি। গম ও ভুট্টা মিলিয়ে উৎপাদন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টনের মতো। স্বাধীনতার পর এটিই ছিলো ১ কোটি ১০ লক্ষ্য টন। তখন মানুষ ছিল সাড়ে ৭ কোটি এখন মানুষ হলো সাড়ে ১৬ কোটি। এর মধ্যে আবাদের আবাদি জমি কমেছে। মাথাপিছু জমি কমেছে কারণ জমিতে মানুষ ঘরবাড়ি করছে শিল্প কারখানা করছে, রাস্তা হচ্ছে। এতোকিছুর পরেও ১ কোটি ১০ লক্ষ টন উৎপাদন বেড়ে সাড়ে ৪ কোটি টনে হয়েছে, মানে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৪ গুণ বেড়েছে।

জুলিয়া: আমদেরতো চালও আমদানি করতে হচ্ছে। এটাতো অস্বীকার করতে পারবেন না?
ড. রাজ্জাক: দেখুন প্রতি বছর আমাদের চাল আমদানি করতে হয় না। ২০১১ থেকে ২০১৪ আমরা খুবই কম আমদানি করেছি। ২০১৭ সালে চাল আমদানি বাড়ে, আবার গত বছর এসে আমদানি করতে হয়েছে। এ বছর আমরা চাল আমদানি পারমিশন দিয়েছি ১০ লক্ষ্য টন কিন্তু আসছে খুবই কম। মাত্র দেড় লক্ষ টন। কই বলতে পারবেন যে দেশে দুর্ভিক্ষ হচ্ছে? এটাই তো দুর্ভিক্ষের সময় আশ্বিন মাস; কেউ বলতে পারবে যে কোন দুর্ভিক্ষ হচ্ছে? কেউ বলতে পারবে যে অমুক এলাকার মানুষ না খেয়ে আছে? খাবার পাওয়া যাচ্ছে না বা বাজারে চাল পাওয়া যাচ্ছে না বা বাজারে চাল নেই? পর্যাপ্ত চাল আছে। তবে আমি স্বীকার করছি দাম বেশি আর যাদের আয় কম তাদের যে কষ্ট হচ্ছে এটাও আমি অস্বীকার করছি না।
জুলিয়া: বিশ্বে করোনা মহামারী শুরু হয় ২০১৯ এর শুরুতে। সে থেকে চলমান খাদ্য সংকটের ৩ বছর পার হয়ে গেছে। এসময়ে সরকার দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কী কী নীতি নিয়েছে আর প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে?
ড. রাজ্জাক: আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনী ইশতেহার, ভিশন ডকুমেন্ট-২০২১ এর মাধ্যমে জাতিকে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে আওয়ামী লীগ যদি সরকার গঠন করলে আমরা দেশের সকল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম কমিয়ে নিয়ে আসব এবং আমরা আরো বলেছিলাম, এমডিজি বাস্তবায়ন করবো দারিদ্র বিমোচন খাদ্যে স্বয়ংসসম্পূর্নতা, স্কুল কলেজের শিক্ষার হার বাড়াবো, মেয়েদের স্কুলে ভর্তি বাড়ানো; এগুলো আমরা অর্জন করবো। ২০১৫ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ দানা জাতীয় খাদ্য যা আমাদের মূল খাবার ধান বা ভাত আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। ২০১৭ সালের মধ্যে এমডিজি বা মিলেনিয়াম ডেভলাপমেন্ট গোল অর্জন করেছি। সারা পৃথিবী আমাদের এনিয়ে স্বীকৃতি দিয়েছে। সারা পৃথিবীতে এটি প্রশংসিত হয়েছে, সারা পৃথিবী আমাদের অনেকভাবে বলেছে যে আমরা অনেক ভালো করেছি। এটা আন্তর্জাতিকভাবেই সমর্থিত। সার্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি হার অনেক বেশী এবং সেটা অব্যহত থাকায় বাংলাদেশ আজকে নিন্ম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে বা ডেভেলপিং কান্ট্রি হতে যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এর হিসাবেই আমরা উন্নত হচ্ছি। কাজেই দেশের সার্বিক উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অর্জন অনেক। অভাবনীয় হলেও এটা এখন দর্শনীয়। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং। এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। ২০১৯ এ যখন করোনা মহামারী শুরু, প্রথম দিকে মানুষ বুঝতে পারে নাই। এপ্রিল মে মাসে ধান কাটার মৌসুম ছিল তখন করোনা শুরু হয় এবং বেশ তীব্র অবস্থা তখন হাওড় এলাকা নিয়ে আমাদের চরম দুশ্চিন্তা ছিল- ধান আমরা ঘরে তুলতে পারবো কি না কাটতে পারবো কিনা। হাওড়ে আগাম বন্যা হয়, হঠাৎ করে আসে এবং সব ধান নষ্ট হয়ে যায়। করোনা শুরুর সময়ও এমন পরিস্থিতি হয় তখন আমি এবং আমার মন্ত্রনালয়ের কর্মীরা, প্রশাসন, কৃষি কর্মকতা আমরা সবাই ঝাপিয়ে পড়ি যেন ধান কাটা হয়। আমরা কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার বা ধান কাটার যন্ত্র দেই, বিভিন্ন এলাকা থেকে যন্ত্র হাওড় এলাকায় নিয়ে যাই, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জে, যেন ধান তাড়াতাড়ি কাটা যায়। এটা বিরাট সফলতা ছিল এবং আমরা সুদুর কুড়িগ্রাম, রংপুর, পাবনা, ঢাকা ও টাংগাইল থেকে শ্রমিক নিয়ে গিয়ে ধান কাটায় সহযোগিতা করি। আমরা ১৯ সালে সফল হয়েছি ২০-২১ সালেও আমরা কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি । চাষিরা যেন পর্যাপ্ত সার পায় তাই আমরা ভুর্তকি দেই। যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন ১ কেজি ডিএপি সার ছিল ৯০-৯২ টাকা, টি এস পি ৮০ টাকা, প্রতি কেজি পটাশিয়াম ছিল ৬০ টাকা, ৬০ টাকার পটাশিয়াম আমরা ১৫ টাকায় নিয়ে এসেছি, ৯০ টাকারটা ২৫ টাকা এবং ৮২ টাকারটা ২২ টাকায় এবং আজ পর্যন্ত আমরা একই দামে বিক্রি করছি যত বেশী দামেই আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করি না কেন। এই মুহুর্তে আমরা এক কেজি ইউরিয়াতে ৫৯ টাকা ভতুর্কি দিচ্ছি। করোনার কারণে এবং এরপর যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাজারে সব সারের দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু আমরা সারের দাম বাড়াইনি। আমরা সবসময় কৃষকের পাশে থেকেছি। আপনি জানেন করোনা যখন শুরু হয় ২০১৯ এ তখন এপ্রিল মে ধান কাটার মৌসুম। আমাদের হাওড় এলাকায় আগাম বন্যা শুরু হয় তখন আমি এবং আমার
মন্ত্রনালয়ের কর্মীরা, প্রশাসন, কৃষি কর্মকতা আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ি যেন ধান কাটা হয়। আমরা কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার বা ধান কাটার যন্ত্র দেই, বিভিন্ন এলাকা থেকে যন্ত্র হাওড় এলাকায় নিয়ে যাই, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জে, যেন ধান তাড়াতাড়ি কাটা যায়। এটা বিরাট সফলতা ছিল এবং আমরা সুদুর কুড়িগ্রাম, রংপুর, পাবনা, ঢাকা ও টাংগাইল থেকে শ্রমিক নিয়ে গিয়ে ধান কাটায় সহযোগিতা করি।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি সারের দাম ৪ থেকে ৫ গুন বেড়েছে। পটাশিয়াম আগে ছিল টন ৩০০ ডলার এখন ১১০০, টিএসপি ইউরিয়া ছিল ২০০-২৫০ ডলার যা এখন ৬০০-৭০০। আমরা কৃষকদের সুবিধায় ও উৎপাদন বাড়ানোতে কৃষকদের প্রনোদনা দিয়েছি। ২০১৯ সালে যখন আমি মন্ত্রী হলাম তখন ডিএপি সারের দাম ৯২ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ টাকা নেয়া হয় এরপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১৬ টাকা করে দেন। এর ব্যবহার আগে হতো ৮ লক্ষ টন এখন সেটা ১৫-১৬ লক্ষ টন ব্যবহার হয়। সরকারের উদ্যোগের ফলেই আমরা ধানের উৎপাদন ধরে রাখতে পেরেছি অন্যান্য ফসলেরর উৎপাদন ধরে রাখতে পেরেছি।
কৃষকদেরকে অনেক সহোযোগিতা করা হয়েছে কম্বাইন্ড হার্ভাস্টোর ও কৃষি যন্ত্রপাতিতে ৫০ থেকে ৭০ ভাগ ভতুকি দিয়ে। একটা মেশিনের দাম যদি ৩০ লক্ষ টাকা হয় ১৫ লক্ষ টাকা সরকার দিচ্ছে। হাওড় ও উপকূলএলাকার জন্য ২১ লক্ষ টাকায় আমরা দিচ্ছি, এখানে কৃষক দিচ্ছে মাত্র ৭ লক্ষ টাকা। এই যে কোভিডের মধ্যেও এত সারের দাম এতো বেড়েছে যে যেখানে আমরা ৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতাম গত অর্থবছরে দিতে হয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। গ্রামের যে কৃষক, গরীব-ধনী সকল কৃষকই এই সুবিধাটা পায়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা এমনিতেই বেশী অস্বাভাবিক, পৃথিবীর কোথাও এত জনসংখ্যা নেই। প্রতিবছর আমরা ২০-২৫ লক্ষ নতুন মুখ দেখি সাড়ে ষোল কোটি মানুষ সর্বশেষ আদমশুমারীতে ২৫ লক্ষ নতুন মুখ এত খাওয়ানো জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে এর মধ্যে ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা এসেছে তাদেরকে আমরা খাওয়াচ্ছি এই পরিস্থিতিতে আমরা এই সরকার শুধু সার না আমরা বিদ্যুতে সেচের জন্য ২০℅ ভর্তুকি দেই, কীটনাশকে দেই, ঝড়বৃষ্টি বা কোন দুর্যোগে ক্ষতি হলে পুনর্বাসন কর্মসুচির আওতায় আমরা চাষিদের নগদ টাকা দেই- এভাবেই কৃষিতে এই সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমরা কৃষিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছি। সার নিয়ে কোনরকম সংকট হয় না, সারের জন্য কৃষকদের কোথাও দৌড়াতে হয় না। বিএনপি দুই বার ক্ষমতায় ছিল তখন চাষীরা ভিক্ষা চায়নি, রিলিফ চায়নি, সার চেয়েছে কিন্তু বিএনপি সরকার সার দিতে পারে নাই। জমি পুড়ে যাচ্ছে, ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা আন্দোলন করেছে, সেটি ঠেকাতে ১৮ জন কৃষককে হত্যা করা হয়েছে ফুলবাড়িতে, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জায়গায়। ২০০১ সালে তারা আবার ক্ষমতায় এসেও বিদ্যুৎ দিতে পারে নাই তখন সেচের বিদ্যুতের জন্য চাপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে মানুষ। ২৫-৩০ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয় সেসময়। আমাদের সরকারের গত ১৪ বছর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ পরিচালনা করে এমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন যে এই সময়ে সারের কোন সংকট হয় নাই বিদ্যুৎ নিয়ে ঝামেলা হয় নাই কৃষক ভালোভাবে চাষাবাদ করতে পেরেছেন।
খাদ্য নিয়ে আবার বলি, করোনাকালে অনেকেই ভেবেছে যে খাদ্য সংকট হবে কিন্তু দেশে কোন হাহাকার হয় নাই। মানুষের এখন একটু কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা গরীব এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকেও সকল পণ্য বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এখন তাই খাদ্য নিরাপত্তা জরুরি। মানুষ বলে না পেটে খেলে পিঠে সয়, মৌলিক চাহিদার প্রধান হল খাদ্য, এই খাদ্যকে সরকার সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এদেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছে ১৯৪৩-এ, এরপর আরও দুর্ভিক্ষের কথা আমরা শুনেছি। ৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। আগে আমাদের মঙ্গা হতো- আশ্বিন- কার্তিক আসলেই দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী এলাকায়। যমুনা নদী ভাঙলেও মানুষ না খেয়ে থাকত। কিন্তু এই ১৪ বছরে মঙ্গা হয় নাই। খাদ্য নিয়ে করোনাকালেই আমরা কোন সংকটে পড়িনি, দুর্ভিক্ষও হয়নি এবারও তা হবে না।

জুলিয়া: বঙ্গবন্ধু ছিলেন কৃষকপ্রাণ। কৃষকের কষ্ট ও মর্যাদা নিয়ে সব সময় ভাবতেন তিনি। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ নেতারা ধনী আর শিল্পপতিদের সুবিধা ও প্রনোদনা নিয়েই বেশি ভাবেন। তাই নয় কি?
ড. রাজ্জাক: প্রশ্নটি খুবই কঠিন। কিন্তু আমরা যদি আমাদের কথাই ভাবতাম তাহলে কি ২৮ হাজার কোটি টাকা সারে দিতাম? তাহলেতো আমরা সারের দাম বাড়িয়ে দিতাম। এত প্রতিকুল অবস্থা বাজেট কর্মসূচিতেও অর্থের ঘাটতি-এমন সময়েও আমরা কৃষিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষকদরদী, ছোটকাল থেকেই কৃষকদের সমস্যা দেখেছেন উনি, পিতার আদর্শ মেনে চলেছেন। আমি বলবো, পৃথিবীর কোন দেশই ওনার মতো কৃষকদের এতো প্রণোদনা দিচ্ছে না বা দেয় নাই। নির্দ্বিধায় কৃষির যেকোন বিষয় তার কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। আমরা যে সার দিচ্ছি এটা কি গুলশানের মানুষ পায়? পায় কৃষকরাই আর কম দামেও পাচ্ছে। কৃষি হলো প্রকৃতি এবং অঞ্চল নির্ভর। বর্ষাকালে, বন্যায় অনেক ফসল নষ্ট হয় অনেক সময়। কৃষিটা অনেকটা প্রকৃতি নির্ভর হওয়ায় আমরাও ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। যেমন এবছর অনেক দিন বৃষ্টি না হওয়ায় আমন রোপনে চাষ দেরি হয় ফলনও কমে আসে। এদেশের কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি গবেষকরা অনেক নতুন ও উন্নত জাতের ধান আবিষ্কার করেছে, চাষ করছে। প্রযুক্তিতেও কৃষি ভালোর দিকে যাচ্ছে। আমরা সবচেয়ে বেশি ভাবছি কৃষকের আয় নিয়ে; তাদের আয় যেন বাড়ে সেজন্য আমরা সহজে বীজ দিচ্ছি, সার দিচ্ছি। ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি বেশি তাই মেশিন দিচ্ছি। মেশিন দিয়ে ধান লাগানোও যায়। এমন সকল কর্মসূচিতে সরকার অবশ্যই কৃষিবান্ধব।
জুলিয়া: শহর ও গঞ্জের সুটেট-বুটেট লোকেরা আজ কৃষকলীগের নেতা- তারা মাঠে যান না, কৃষকের চাহিদা বোঝেন না, কষ্টও বোঝেন না। এনিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবে আপনি কি বলবেন?
ড. রাজ্জাক: সেটা কিভাবে যে বলবো! আমি অবশ্য এভাবে বলতে চাই না। দেখুন অনেক শ্রমিক নেতা আছেন যারা শ্রমিক নন কিন্তু শ্রমিকদের জন্য আন্দোলন করে। কৃষকদের জন্যও এটি প্রযোজ্য। তারাও অনেক কৃষকদরদী। তবে সত্যি বলতে যদি কৃষকদের জন্য যারা সত্যি কাজ করে এবং নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা যাদের আছে তারা যদি নেতা হয় সেক্ষেত্রে কৃষকরা আরও সুবিধা পাবে।
জুলিয়া: কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও তো সব সুবিধা শিল্পপতিরাই পায়। কৃষকরা আসলে কতটুকু পায়?
ড. রাজ্জাক: আপনি ঠিকই বলেছেন। অনেক সময় কৃষি ভিত্তিক শিল্পায়নের অর্থ বরাদ্দ বড় বড় ব্যবসায়িরা নিয়ে অন্য কাজে লাগায় কৃষিতে বিনিয়োগ করে না। এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আরও কঠোর তদারকি করতে হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি দেখেন ১ কেজি ভুট্টা ২০ টাকা। কিন্তু ভুট্টার কর্নফ্লেক্স বিদেশ থেকে আসে যার ৪৫০ গ্রামের দাম ৪০০ টাকা। ২০ টাকার জিনিস প্রক্রিয়া করে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৪০০ টাকা। আপনি চিন্তা করতে পারেন ৫০ গ্রাম পটেটো চিপস লেইস এর দাম ৩০-৩৫ টাকা! আবার দেশের বাজারে যে পটেটো চিপসের দাম ৫ টাকা সেটিই ভ্যালু এড করে দাম করছে ৩০-৩৫ টাকা। কাজেই এই ভ্যালু এডিশনে ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে কৃষকদের সাহায্য করতে চাচ্ছি। কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ হলে আমাদের কৃষকরা আয় বাড়াতে পারে এবং সেই
আয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান ভালো করতে পারে ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারে, ভালো জামা কাপড় দিতে পারে। কৃষকের আয় বাড়াতে হবে তাহলেই দেশের উন্নয়ন হবে। দেশের ৬০-৭০ ভাগ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে এবং তাদের জীবিকার ভিত্তি কৃষি তাই এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

জুলিয়া: কৃষি যান্ত্রিকীকরণেও তাই- সরকারের দেয়া সুবিধা কিন্তু নিয়ে নিচ্ছে ধনীরা। তাই নয় কি?
ড. রাজ্জাক: দেখুন এখন চাষীরা মেশিন পায় ধান কাটার জন্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আগাম ও দ্রুত ধান কেটে ফেলা এবং শ্রমিক খরচ কমাতে এই উপকার কম বেশী সবাই পাচ্ছে। একটা মেশিনের দাম ২০-৩০ লক্ষ টাকা, গরীব চাষিতো সেটা কিনতে পারে না কারণ ধনী কৃষকও এটি ক্রেডিটে কেনে। তাই এই সুবিধা সবাইকে দেয়া খুবই কঠিন, কিন্তু ধনীরা সেই সুবিধাটাই পাচ্ছে। সব কৃষকই ধান কাটার সময় মেশিন ভাড়া করে। দশ জন শ্রমিকের পেছনে যে খরচ হতো এখন মেশিনে সেই খরচ অনেক কমে যাচ্ছে। ধনী কৃষকরাই মেশিন কিনছে এটা সত্যি, কিন্তু যদি কৃষকরা এসে বলে যে তারা ৬-৭ জন মিলে গ্রুপ করে মেশিন নিতে চায় সেক্ষেত্রে আমরা মেশিনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবে সেটাও গরীব কৃষকের পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
জুলিয়া: কৃষি খাতে আইটি সুবিধা ব্যবহার করে অনেক দেশ এগিয়ে গেছে। আমরা কোথায় আছি?
ড. রাজ্জাক: আমরা মার্কেটিং অ্যাপস দিয়েছি। যাতে চাষীরা খবর নিতে পারে বাজারে কি দাম চলছে। আমাদের মার্কেটিং বিভাগের লোকেরাও এখন কৃষককে তথ্য দিচ্ছে যে কারওয়ানবাজারে পেঁয়াজের দাম আজকে ত্রিশ টাকা, এই সবজির দর এতো ওই সব্জির কেজি এতো আপনারা এর চেয়ে খুব কমে যেন না বিক্রি করেন। আমরা অর্গানিক খাদ্যের বিপননের ব্যবস্থা করছি। খাদ্য উৎপাদনও এমনভাবে করা হবে যেন কারো জন্য ঝুকিপূর্ণ না হয়। এটা বিশ্ববাজারে রপ্তানিরও চেষ্টা করব। আইসিটির গুরুত্বও অনেক। কোন জমিতে কি পরিমাণ ফসল হবে, আরো সেচ দেয়ার দরকার আছে কিনা, কি পরিমাণ সার দিতে হবে, কোন জমিতে কোন ফসল বেশি হবে এসব জানতে আইসিটির গুরুত্ব অপরিসীম। আইসিটির সহায়তা নিয়ে আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ এড়ানোও সম্ভব।
জুলিয়া: বাজার আর কৃষকের দুরত্ব এখনো অনেক। মানিকগঞ্জ বা বগুড়ার চাষির বিক্রি করা ১৫ টাকা কেজির সবজি ঢাকার ভোক্তা কেনেন ৬০ টাকায়। এই করুণ গল্পের কি শেষ হবে না?
ড. রাজ্জাক: এটা খুবই দুঃখজনক। আমি মন্ত্রী হিসেবেও এর দায় এড়াতে পারি না। আমি মনে করি এসবের দায়িত্ব আমাকেও নিতে হবে। আসলেই আমাদের কৃষকদের পরে অনেক মধ্যসত্বভোগী আছে। এরা অবশ্য সব দেশেই আছে। এটাকে আমরা ফরিয়া বলি আর মহাজনই বলি সবাই গুদামজাত করে লাভের আশায়। কিছু পণ্য পচে নষ্ট হয়। কিছু পয়েন্টে সামাজিক ও রাজনৈতিক হয়রানির হয়। এই সব কিছুর প্রভাবেই মানিকগঞ্জের ২০ টাকা কেজির সবজি ঢাকায় এসে ৫০-৬০ টাকা হয়ে যায়। আমাদের সবার উচিত এসব ঠেকানোর ব্যবস্থা নেয়া। তবে এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে আশা করা যায় যে, কৃষককে বেশি দিন ঠকানো যাবে না। একটা সময় পরিবর্তন হবে বলে আমি খুবই আশাবাদি।
জুলিয়া: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. রাজ্জাক: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
একাত্তর/এআর
