উঠে গেলো বহুল আলোচিত ব্যাংক ঋণের নয়-ছয় সুদহারের বাধ্যবাধকতা। আগামী পহেলা জুলাই থেকেই ঋণের সুদ হার হবে উন্মুক্ত। রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় সব ক্ষেত্রে ডলার বিক্রি হবে এক দরে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগামী অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থনৈতিক কারণ নয়, ভূ-রাজনৈতিক কারণেই আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মুডিস’ বাংলাদেশের রেটিং কমিয়েছে । কারণ ২০১২ সালে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মুডিস বাংলাদেশকে পজিটিভি রেটিং করেছিল। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক ভালো হওয়ার পরও কমানোর পেছনে ভূ-রাজনীতি আছে বলে জানান গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় এসব কথা বলেন।
এবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে চারটি নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বহুল আলোচিত ৯ শতাংশ সুদহার সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।
গভর্নর জানান, আগামী পহেলা জুলাই থেকে ব্যাংক ঋণে সুদহারের কোনো সীমা থাকছে না। বাজারভিত্তিক হবে ঋণের সুদ হার। তবে সর্বোচ্চ সীমার বাইরে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণের সুদহার নিতে পারবে না। তবে ভালো গ্রাহকদের জন্য ঋণের সুদহার কমাতে পারবে তারা। বাজারভিত্তিক সুদ হার নির্ধারণের এই পদ্ধতির নাম দিয়েছে শর্ট টার্ম মুভিং অ্যাভারেজ রেট (স্মার্ট)। সরকারি ট্রেজারি বন্ডের ছয় মাসের গড় সুদ হারের সঙ্গে বেসিস পয়েন্ট যোগ করে তার ওপর ব্যাংকগুলো তিন শতাংশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ শতাংশ বেশি হারে ব্যাংক ঋণের সুদ হার নিতে পারবে।
তবে এসএমই ও কনজুমার ঋণের ক্ষেত্রে তদারকি খরচ বেশি হওয়ায় এ দুই খাতে আরও এক শতাংশ সুদ হার বাড়াতে পারবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই ব্যাংক ঋণের সুদহার নয় ছয় বেধে দেয়া হয়েছিল তখনকার বাস্তবতায়। তাই এখনকার ব্যাংকিং খাতসহ আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজনৈতিক কারণেই ব্যাংক ঋণের ক্যাপ তুলে দেয়া হয়েছে।
গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার জানান, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে চার ধরনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক মুদ্রানীতি প্রচলিত আছে। সুদহার, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা সরবরাহ এবং বিনিময় হার টার্গেটিং।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এতদিন মূল্যস্ফীতি টার্গেট করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছিল। এবার আমরা সুদহার টার্গেটিং করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে। মুদ্রানীতিতে এটা বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বলা যায়।
হুন্ডির মহামারি চলছে, যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়সহ সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলোকে ডলার বিক্রি করতে হবে এক দরে। আমদানির ক্ষেত্রে অর্থাৎ ডলার ক্রয় এর দর হবে অভিন্ন।
তিনি বলেন, আইএমএফ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে ঋণ চু্ক্তি অনুযায়ী মোট রিজার্ভ ও নেট রিজার্ভ দুইভাবে রিজার্ভ দেখানো হবে। তবে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশও নেট রির্জাভ প্রকাশ করবে না । কারণ আইএমএফও নেট রিজার্ভ কত সেটা প্রকাশ করার কথা বলে না কখনো।
রিজার্ভ কম প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে চলতি অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। রমজানে মাসে দ্রব্য মূল্য আমদানি না করে ডলার জমিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই বলে জানান রউফ তালুকদার।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে দেশে লোডশেডিং করে ডলারের রিজার্ভ বাড়ানোর কোনো মানে নেই।
এসময় তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা মুডিস বাংলাদেশের রেটিং কমিয়ে দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। মুডিসের রেটিং কমানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,অর্থনৈতিক কারণ নয়, ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের ঋণ মান কমিয়েছে মুডিস। ২০১২ সালে প্রথম তারা যখন রেটিং দিয়েছিল তখন দেশের রিজার্ভ ছিল অনেক কম। আমদানি, রপ্তানিসহ অর্থনীতির আকার এতো বড় ছিল না। সে তুলনায় এখনকার অবস্থা অনেক ভালো, অথচ মুডিস মান কমিয়ে দিল। বাংলাদেশের যেহেতু সভরেন বন্ড নেই তাই মুডিসের রেটিং নিয়ে কোনো চিন্তা নাই। বিদেশি বিনিয়োগে এই রেটিংয়ের কোনো প্রভাব পড়বে না।
মুদ্রানীতি ঘোষণায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমান বলেন, এবারের মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকে রেপো সুদহার ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর রিভার্স রেপো ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি ঋণের যোগান এবং ব্যাংক খাতসহ দেশের বাজারে টাকার সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিক নির্দেশনা দিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একাত্তর/এসি
