কংক্রিটের জঞ্জাল এই শহরের শব্দে মিশে আছে কোলাহল, ব্যস্ততা আর ধুলোবালি। বিশাল অট্টালিকা মাঝে চড়ুই, শালিক বা কাঠবিড়ালীর অবাধ ও ভীতিহীন চলাচল আজ আর নেই। এমন কি দেখাও যায় এসব প্রাণীকূলকে। এদের বাসভূমি এখন নোংরা, পরিত্যক্ত ও ভূমিদস্যুদের দখলে। বিপরীতে এমন মানুষও পাওয়া যাবে, যার পরম মমতায় আপন হয়ে গেছে এসব ছোট্ট প্রাণীকুল।
মাধবীলতার শাখা প্রশাখা বিছানো চারুকলার বাউন্ডারির দেয়ালে। ক্লান্ত পথিক নীরব মনে সেখানে একটু দাঁড়ালে শুনবে পাখিদের কিচিরমিচির। দেখবে কাঠবিড়ালিদের দৌড়-ঝাঁপ। ভরদুপুরে মাধবীলতায় চড়ুই আর শালিকের কিচিরমিচিরের শব্দ যেন বেড়ে যায়। চলতি পথে হঠাৎ ক্যামেরার চোখ আটকে যায় এমন দৃশ্যে, ইঁদুর কাঠবিড়ালীর খাবার নিয়ে লুকোচুরিতে। কিছুক্ষন অপেক্ষা একাত্তরের ক্যামেরার।

আপস...পাশের রাস্তার গর্ত থেকে কয়েকটি ইঁদুরও বের হয়ে আসে হঠাৎ কারো ‘আয় আয়’ ডাকে। ইদুর মানুষ দেখলে দৌড়ে পালায় অথচ এগুলো মুখ তুলে নির্ভয়ে খাবার খাচ্ছে মানুষটির হাতে। কুকুর, বিড়াল কিংবা পাখিকে অনেকেই পোষ মানায়। তাই বলে ইঁদুর!
ইদুর বিড়াল আর পাখির খাবার শেষে নিজের খাবারে প্রস্ততি মানুষটির। এর মাঝেই পণ্য কিনতে ক্রেতারও ভীড় আছে। কথা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমান বয়স কামাল উদ্দিন সেন্টুর।
অষ্টম শ্রেণি পাস সেন্টু এক যুগেরও বেশি সময় ফুটপাতে কালো সুতায় বাঁধানো লকেট, মালা, হাতে বানানো আংটি, ব্রেসলেট এসব বিক্রি করছেন। আর বছর ৪ ধরে ভর দুপুরে ইঁদুর কাঠবিড়ালি আর পাখিদের খাবার দিয়ে অদৃশ্য বন্ধন গড়ে তুলেছেন। ঢাকার হাজারীবাগে জন্ম। আগে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে জিনিসপত্র বিক্রি করেছেন, চাকরিও করেছেন কিছুদিন।

খাবারের জন্য উদভ্রান্ত হয়ে ইঁদুর কাগজ আর ফসল কাটে, পাখি অস্থির হয়ে ওঠে বলে ভাবেন সেন্টু। তিনি ভাবেন মানুষওতো ক্ষুধায় উন্মাদ হয়ে ওঠে। তাই খাবার সরবরাহ রাখতে হবে সৃষ্টির সকল প্রাণীর জন্য। মানুষ সৃষ্টির সেরা, তার অনেক দায়িত্ব।
চা, সিগারেট ও পানসহ বাড়তি সব বাদ দিয়ে সেই টাকায় প্রাণীদের খাবার বিলিয়ে বেড়ান এই মানুষটি। প্রাণীরা কথা বলতে পারে না কিন্তু তারা অনুভব করতে পারে। সেটাইতো অনেক বলেন তিনি। তার চারপাশে কোনো পুরস্কার বা প্রশংসাপত্র নেই। কোনো কিছুর আশা না করেই তার মমতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন চারপাশে।
মানুষটি ভাবে খোলা আকাশের নিচে তাঁর এই দোকান একদিন হয়তো থাকবে না। মাধবীলতার আড়ালে পাখিগুলো তখনও কিচির মিচির করবে। কাঠবিড়ালিগুলো অপেক্ষায় থাকবে খাবারের, ইঁদুরগুলোও গর্ত থেকে উঁকি দেবে। তখনও মাধবীলতার পাতাগুলো হয়তো দোল খেতে থাকবে বাতাসে। তার বিশ্বাস তখন হয়তো অন্য কেউ ডাকবে।
