সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক ঐতিহাসিক জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এ সময় তিনি সেনাবাহিনীতে ‘আত্মশুদ্ধি’র আহ্বান জানানোর পাশাপাশি র্যাব ও ডিজিএফআই বিলুপ্তির দাবি তোলেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি তাঁর দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দি দেয়ার সময় এসব কথা জানান।
জবানবন্দির শুরুতেই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল করিম বলেন, অনেকেই ভাবছেন আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা যতই অস্বীকার করি না কেন, সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানে সেনাবাহিনীর সামনে আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে, তা কোনো ভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। অপরাধীদের বিচার হলে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং তা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সাবেক এই সেনাপ্রধান তাঁর জবানবন্দিতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় র্যাব ও ডিজিএফআই-এর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। সেটি সম্ভব না হলে অন্তত সামরিক সদস্যদের দ্রুত নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। তিনি বলেন, ‘আয়নাঘর’-এর মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেয়ার পর ডিজিএফআই আর টিকে থাকার নৈতিক বা আইনগত বৈধতা রাখে না।
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রকাশ করেন, র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়ায় তিনি এক পর্যায়ে র্যাব, ডিজিএফআই ও বিজিবিতে অফিসার পোস্টিং বন্ধ করে দেন। তৎকালীন র্যাব ডিজি বেনজীর আহমেদ এবং এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে চট্টগ্রাম রেডিসন হোটেলের এক বৈঠকে তাঁকে অফিসার দেয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। অনেকে একে ‘বিদ্রোহের শামিল’ বললেও পরকালের জবাবদিহিতার ভয়ে তিনি পিছু হটেননি।
এর আগে গত রোববারের জবানবন্দিতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিককে নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য দেন। তাঁর মতে, তারিক সিদ্দিকী নিজেকে ‘সুপার চিফ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও এনটিএমসি নিয়ে একটি ‘অপরাধ চক্র’ গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, গুম ও খুনের মতো ঘটনা ঘটানো হতো।
সাবেক সেনা প্রধান জানান, সিভিলিয়ানদের তুলে নিয়ে ডিজিএফআই-এর সেলে রাখার বিষয়টিকে একটি অভ্যাসে পরিণত করা হয়েছিল। এছাড়া, ২০০৩ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই সময় বহু মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, যাকে তিনি ‘লাইসেন্স টু কিল’ বলে অভিহিত করেন। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই পরবর্তীতে আরও বড় অপরাধের পথ প্রশস্ত করেছে।
জবানবন্দির একপর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া নিজেকে একজন ‘ডিহিউম্যানাইজড সেনা কর্মকর্তা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সামরিক প্রশিক্ষণে মানুষ হত্যার কৌশলই শেখানো হয়। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজকের মতো জেরা স্থগিত করা হয়েছে। মামলার পরবর্তী জেরার দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলার বিচার কাজ পরিচালনা করছেন। মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।
