জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল আইনগুলো মানুষের মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য এখনো বড়ো ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় এই প্রতিটি আইনই পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল রাইটস এশিয়া-প্যাসিফিক (ড্র্যাপ্যাক) বাংলাদেশ জাতীয় সম্মেলন ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন।
ইন্টারনেটে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটাল রাইট’ ও ‘এনগেজমিডিয়া’ এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে সেশন পার্টনার হিসেবে ছিলো ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও ডি-নেট।
টিআইবির আয়োজনে প্রথম প্লেনারি আলোচনায় সাইবার সুরক্ষা আইন, সংশোধিত টেলিযোগাযোগ আইন ও উপাত্ত সুরক্ষা আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, নতুন আইনগুলোতে নানা অসংগতি আছে এবং এগুলো জুলাইয়ের চেতনা কিংবা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুরনো আইনগুলোই নতুন নামে আনা হয়েছে, যা মানুষের ক্ষমতায়নে তেমন সহায়ক হয়নি।
তিনি আরও আক্ষেপ করেন যে, অতীতে এসব আইনের অপব্যবহারের শিকার হওয়া নেতারাই আবার একই ধরনের আইন প্রণয়ন করেছেন।
আলোচনায় ডেইলি স্টারের জয়েন্ট এডিটর আশা মেহরীন আমিন বলেন, আগের মতো এখনও ফেসবুক পোস্টের কারণে মামলা হচ্ছে। সাংবাদিকেরা আগে যেমন নজরদারির ঝুঁকিতে ছিলেন, এখনও তেমনই আছেন।
সম্মেলনে বাংলাদেশে ইউনেস্কোর হেড অব রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেন, প্রতিটি আইনকে সমাজের নিরিখে যাচাই করা প্রয়োজন। মানবাধিকার রক্ষার জায়গাগুলো উন্নত করতে নতুন সরকারকে আইনগুলো পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ কাজে লাগানোর আহবান জানান তিনি।
তবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, এই আইনগুলো জরুরি। কোনো সমস্যা থাকলে তা পরে সংশোধনের সুযোগ আছে এবং সরকার তা উন্নয়নে কাজ করছে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় সেশনে মেটার পাবলিক পলিসি ম্যানেজার রুজান সারওয়ার বলেন, উপাত্ত সুরক্ষা আইনের কিছু ধারা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে সংসদে পাস হওয়া চূড়ান্ত আইনটি মেটা ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য ইতিবাচক। সম্প্রতি ফেসবুকে উসকানি দিয়ে গণমাধ্যমে হামলার প্রশ্নে তিনি বলেন, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ানো হবে।
টেলিনর এশিয়ার প্রত্যুষ রাও টেলিযোগাযোগ আইনের ৯৭ক ধারা নিয়ে গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, বিটিআরসির কমিশনার মাহমুদ হোসাইন বলেন, শক্তিশালী কিছু গোষ্ঠী নীতিনির্ধারকদের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারলেও অন্যরা পারে না, যা আস্থার অভাব তৈরি করে। স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কণ্ঠ যাতে হারিয়ে না যায়, সেদিকে নজর দেওয়ার দাবি জানান শেয়ারট্রিপের প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া হক।
তৃতীয় সেশনে ডি-নেটের নির্বাহী চেয়ার ড. অনন্য রায়হান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা প্রণয়নে অর্থবহ আলোচনার তাগিদ দেন।
সমাপনী বক্তব্যে ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স শুধু সরকার বা কোম্পানির বিষয় নয়, এতে নাগরিক সমাজ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতের প্রতিফলন থাকতে হবে।
সম্মেলনে টিআইবি, ডি-নেট ও ডিজিটালি রাইটের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
