নোয়াখালীতে কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠীর আশ্রয়-পশ্রয়ে অপরাধ করে আসছে। তারা, মারধর, ছিনতাই, নারীদের লাঞ্ছিত, এমনকি হত্যায়ও জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধ প্রবনতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলেও মনে করছেন অনেকে।
মঙ্গলবার (১ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নোয়াখালী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে নারীর প্রতি সংঘটিত সহিংসতা সংক্রান্ত নাগরিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে অতিথিরা এসব কথা বলেন।
অতিথিরা আরও বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদেরও সামাজিকভাবে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের অপরাধ দমনে এগিয়ে আসতে হবে।
এসময় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক প্রতিবেদন পাঠ করেন নোয়াখালী নারী অধিকার জোটের সভানেত্রী লায়লা পারভিন।
তিনি বলেন, নোয়াখালীতে নারী, শিশু ও কিশোরীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলছে। গত তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২২) নোয়াখালীতে সংঘটিত ৩৯টি সহিংসতার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৬ জন শিশু, কিশোরী ও নারী। যাদের অধিকাংশের বয়স ৬-১৮ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে সেনবাগ উপজেলায় একটি মাদরাসার শিক্ষক কর্তৃক আবাসিক হলের ১০টি শিশুকে বলৎকারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবন্ধী শিশু বা নারী ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নারীদের ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে বার বার ধর্ষণে বাধ্য করা এবং টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। তিন জন কিশোরীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছে।

লায়লা পারভিন আরও বলেন, যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে সাত জন নারীকে।
নারী অধিকার জোটের সদস্য সচিব মনোয়ারা মিনু বলেন, সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ধর্মীয় সমাবেশে নির্বিঘ্নে নারী বিদ্বেষী অবাধ প্রচার, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির অপতৎপরতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি দৃষ্টি না দেওয়া নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
নারী অধিকার জোটের সদস্য আবদুল আউয়াল বলেন, কিশোর ও তরুণদের সমাজ বিরোধী হওয়ার পিছনে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ি।
অনুষ্ঠানের শেষের দিকে আটটি জন দাবি উল্লেখ করেন নারী অধিকার জোটের সভানেত্রী লায়লা পারভিন।
দাবি গুলো হলো- ১. শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। ২. নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক দুষ্টচক্র কর্তৃক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ৩. স্কুল কলেজের শিক্ষক এবং অভিভাবকদের পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রীরা যাতে সংস্কৃতি, খেলাধূলা ও সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. নারী বাইরে গেলে অনিরাপদ এ ধরনের ভ্রান্ত ধারনা না দিয়ে নারী ও কন্যা শিশু যাতে নির্বিঘ্নে পড়ালেখা ও চলাচল করতে পারে সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে শিক্ষক, প্রশাসন এবং রাজনীতিবিদদের পদক্ষেপ নিতে হবে। ৫. অভিভাবক এলাকার যে কোন ঘটনায় যোগাযোগ এবং তথ্য দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করবে এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গুরুত্বের সাথে বিষয়টি আমলে নিবে। ৬. গ্রামে হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনায় সালিশ বিচার বন্ধ করা এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ৭. রাস্তা ঘাট ও গণপরিবহনে নারীর প্রতি অসৌজন্যমূলক ও কটূক্তি মূলক আচরণ বন্ধ করা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারী নিশ্চিত করতে হবে। ৮. নিরাপদ ভ্রমণের জন্য ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আলাদা স্কুল বাস ও বিশেষ গণপরিবহন চালু করতে হবে।
সভায় নারী অধিকার জোটের সদস্য লাকী আক্তার, ফোজিয়া নাজনীন, সাজেদা আক্তার লাভলি, ফাহমিদা জেসমিনসহ জেলায় কর্মরত প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
একাত্তর/ এসি
