এক বছর সাত দিন সাজা হলেও প্রকৃত ঠিকানা না থাকায় দীর্ঘ প্রায় চার বছর বন্দি থাকার পর অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক ও একাত্তর টিভির জেষ্ঠ্য চিত্রগ্রাহক শামসুল হুদার প্রচেষ্টায় ভারতের নাগরিক শেভরন কুমার ওরফে শ্রাবণ কুমারকে তার নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়া হলো।
বুধবার দুপুর একটার দিকে চুয়াডাঙ্গার গেদে চেকপোস্টের জিরো পয়েন্টে চুয়াডাঙ্গা বিজিবি ও জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ এবং এ্যামেচার রেডিও সোসাইটি বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল হুদার উপস্থিতিতে শেভরন কুমার শ্রাবণকে ভারতীয় বিএসএফের মাধ্যমে তার বাবা দেবানন্দ ঋষিদেবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২০২০ সালের ২ জানুয়ারি নাটোর সদর থানা পুলিশের হাতে আটক হয় শেভরন। নাটোর থানা পুলিশ তার বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আদালতে সোপর্দ করে। এ অপরাধে নাটোর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে শেভরন কুমার শ্রাবণকে এক বছর কারাদাণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৭দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। তার সাজার মেয়াদ শেষ হলে তাকে তার নিজ দেশে পাঠানোর জন্য নাটোর জেলা কারাগার থেকে শেভরনকে ২০২২ সালে মে মাসে চুয়াডাঙ্গা কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

চুয়াডাঙ্গায় জেলা কারাগার থেকে গত গেদে বর্ডার দিয়ে শেভরনকে নিজ দেশে পাঠাতে চাইলে অভিভাবক ও প্রকৃত ঠিকানা না পাওয়ায় বিএসএফ শেভরণকে গ্রহণ না করে বাংলাদেশে ফেরত দেয়।
এরপর চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারের জেলার ফখর উদ্দিন অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক ও একাত্তর টিভির জেষ্ঠ্য চিত্রগ্রাহক শামসুল হুদার সাথে শেভরনের প্রকৃত অভিভাবকদের ঠিকানা খোঁজার দায়িত্ব দেন। পরে শ্রাবণের ঠিকানা ও মাতা-পিতার সন্ধান পাওয়া যায়।
কারা কর্তৃপক্ষ ফখর উদ্দিন বিষয়টি বাংলাদেশ সীমান্ত বিজিবি - চুয়াডাঙ্গাকে জানালে বিজিবি ভারতীয় বিএসএফের গেদে কোম্পানি কমান্ডার ভিথাসি এইচকে জানালে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় নাগরিক শেভরন কুমার শ্রাবনকে গ্রহণ করে।
অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি বাংলাদেশ’র সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামসুল হুদা জানান, শেভরনের পরিবারকে খুঁজে দেয়ার মিশন শুরুর পর জেলার শেভরনের বিষয়ে কিছু তথ্য পাঠান। ভারতের বিহার অঙ্গরাজ্যের আরারিয়া জেলার রানীগঞ্জ থানাধীন বৈবাগ নামের একটি গ্রামে তার বাড়ি। তথ্য শুধু এতটুকুই।
তিনি জানান, শুরুতেই বিহারের আরাবিয়া জেলা খুঁজে বের করা হয়। এরপর জেলার অধীনে কতগুলো থানা আছে সেটির তালিকাও পাওয়া যায়; যেখানে রানীগঞ্জ নামের একটি থানাও ছিলো।
গত ২৯ মার্চ রানীগঞ্জ থানায় ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে সব জানানো হলেও দায়িত্বরত কর্মকর্তা কোনভাবেই তথ্য দিতে রাজি হননি বলে জানান হুদা।
তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ মানুষ এ ধরণের ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চান। এখান থেকে কোন আশা না দেখে আবার গ্রাম খোঁজা শুরু হয়।
তিনি জানান, রানীগঞ্জ উপজেলার অধীনে ৮৫টি গ্রাম পাওয়া যায়। সবগুলো মিলিয়ে ৩০টি পঞ্চায়েত আছে। রানীগঞ্জ পড়েছে বিশানপুর পঞ্চায়েতের অধীনে। এর দুইটি গ্রামের একটির নাম ‘বানভাগ’ বা প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ‘বৈবাগ’। গ্রামটির লোকসংখ্যা চার শতাধিক।

হুদা জানান, গেলো ১৪ এপ্রিল থেকে পঞ্চায়েত প্রধান সরোজকুমার মেহতাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য পাঠানো হয়। কিন্তু তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, এতেও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। এর আগে, বিহারের দীপককে ফিরিয়ে দেয়ার সূত্র ধরেই তার পরিবারের কাছে পঞ্চায়েতের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার অনুরোধ করা হয়। দীপকের আত্মীয়রা সবটা জেনে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ভারতের জাতীয় নির্বাচনের ব্যস্ততার কারণে কিছুদিন সময় নেন।
তিনি জানান, এর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা জেল থেকে শেভরনকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও বৈধ অভিভাবকের অভাবে তা সম্ভব হয় নি।
তিনি জানান, কয়েকদিন আগে গ্রামপঞ্চায়েত প্রধানের সাথে যোগাযোগ হলে তিনি জানান, অন্য একটি গ্রাম থেকে শেভরনের পরিবারকে খুঁজে পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তার আসল নাম শ্রাবণ কুমার। বাবা দেবানন্দ ঋষিদেব খামারে কাজ করেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

ছেলের খোঁজ পেয়ে পরিবার জানায়, শ্রাবণের জন্ম ১৯৯৯ সালে। নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে শ্রাবণ মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। ঋণ করেও তারা অনেক জায়গায় খুঁজে বেড়িয়েছেন ছেলেকে। কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।
শামসুল হুদা জানান, বিষয়টি বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তিনি ১৯ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
ভারতের নাগরিক ঘরে ফিরছেন মানসিক প্রতিবন্ধী শেভরন কুমার ওরফে শ্রাবণ কুমার (২৫) শেভরন ভারতের বিহার প্রদেশের আড়ারিয়া জেলার রানীগঞ্জ থানার বৈরাগ বার্কি গ্রামের দেবানন রিশি দেবের ছেলে।
দেবানন্দ ঋষিদেব একাত্তরকে বলেন, অনেক খুঁজেছিলাম ছেলেকে। এতদিন পরে তাকে পেয়েছি, এই আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। আমার ছেলে পেয়েছি। বাংলাদেশকে ধন্যবাদ। ভারত এবং বাংলাদেশের সরকারকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই।
এসময় বাংলাদেশ জয়নগর বিজিবি কোম্পানি কমান্ডার জালাল হোসাইন, ইমিগ্রেশন অফিসার আতিকুর রহমানসহ উভয় দেশের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকের চেষ্টায় ঘরে ফিরছেন জেলে থাকা ভারতীয় তরুণ