কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করার দাবি করেছে পুলিশ। একটি দামী আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাকে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
মর্মান্তিক এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ চারজনকে আটক করেছে। রোববার দুপুর আড়াইটায় আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রখ্যাত লেখক ড. নাহিদা বেগম এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, গত শুক্রবার বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে অভিযুক্ত সাইফুর ইসলাম তুহিন কৌশলে অপ্রতিমকে সাথে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের ‘সানন্দা’ নামক একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশ করে। পরবর্তীতে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তুহিনকে শনাক্ত করা হয় এবং তাকে দ্রুত পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন স্বীকার করে, মূলত অপ্রতিমের আইফোনটি ছিনতাই করার উদ্দেশ্যেই তাকে ওই সুনসান জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই ঘটনার পেছনে শুধু একা তুহিন নয়, বরং তার আরও দুই সহযোগী মোফাজ্জেল হোসেন ফাহাদ ও কামরুল হাসান জড়িত ছিল। অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে লালমাই পাহাড়ে অপ্রতিমের কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইলটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে একপর্যায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল একে একে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় মারাত্মক আঘাত করে। মাথায় সজোরে লাঠির আঘাতে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযুক্ত তুহিন নিহতের মোবাইলটি সঙ্গে নিয়ে সঙ্গীদের সাথে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা ঝোপঝাড় থেকে পুলিশ নিথর মরদেহটি উদ্ধার করে।

হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া আসামিদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ও নিশ্চিত করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের মূল অভিযুক্ত সাইফুর ইসলাম তুহিন (১৯) কুমিল্লা সিটি কলেজ থেকে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হয়ে পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়েছিল। তার সহযোগীদের মধ্যে মোফাজ্জেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং কামরুল হাসান (১৮) দক্ষিণ উপজেলার হাতিগাড়া গ্রামের বাসিন্দা। মূল এই তিনজন ছাড়াও মো. সিয়াম (১৯) নামে আরও এক তরুণকে আটক করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা ঠিক কতটুকু তা সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকলেও অপ্রতিম হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আটক সিয়ামের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা যাচাই শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
