এল নিনো প্রভাবে আসছে বড় আবহাওয়া বিপর্যয়

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০ এএম

প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া হিসাবে পরিচিত 'এল নিনো'র প্রভাব বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করায় পৃথিবী চরম আবহাওয়ার এক বিপজ্জনক অঞ্চলে প্রবেশ করেছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে এবং অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

এল নিনো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক রূপ বদলে দেয়, যার ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে ভয়াবহ খরা দেখা দেয় আবার কোথাও অস্বাভাবিক টাইফুন ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তামপাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে কিছু স্থানে উষ্ণতা চরম রূপ নেবে। গুতেরেস বলেন, আমাদের চোখের সামনেই এল নিনো অতি-বিশাল রূপ ধারণ করছে। বিজ্ঞানের কাছে এটি স্পষ্ট, পৃথিবী এখন এক চরম অনিশ্চিত অচেনা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সাগর-মহাসাগর ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে।


মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে বিশ্বজুড়ে নেওয়া নানা পদক্ষেপ নিয়ে বিবিসি সরকার ও বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলেছে। দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং আগাম চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও, এই পরিস্থিতির তীব্রতা বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের সংস্থা ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এল নিনোর ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস যাতে যথাসম্ভব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, সেজন্য তারা এক ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলসেতে সাউলো সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সমাজ ও অর্থনীতির ওপর এক বিধ্বংসী আঘাত হানার ক্ষমতা রয়েছে এল নিনোর।

এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুমণ্ডলের বায়ুর রূপ পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলে তাপ নির্গত করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্রান্তীয় মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি অতি শক্তিশালী এল নিনোর স্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রধান নজরদারি অঞ্চলে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ওপরে রয়েছে, যা একে "অত্যন্ত শক্তিশালী" ক্যাটাগরির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি মাসিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, যা অন্তত ১৯৫০ সালের পর থেকে এল নিনোকে সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ দেবে।


প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে এই তাপমাত্রা আরও ব্যতিক্রমী রূপ নিয়েছে, কিছু স্থানে তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। এছাড়া ভারত মহাসাগর, ক্রান্তীয় আটলান্টিক এবং অস্ট্রেলীয় উপকূলীয় অঞ্চল সহ অন্যান্য সাগরেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা প্রত্যাশিত।

সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ার জন্য সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি সামুদ্রিক তাপদাহে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে, যার ফলে ব্যাপকভাবে প্রবাল প্রাচীরের ব্লিচিং (রংহীন হয়ে যাওয়া) ও ক্ষতিকারক শৈবালের বংশবৃদ্ধি ঘটেছে এবং অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক ড. অ্যালিস্টার হবডে জানান, জলবায়ু বিপর্যয় সৃষ্টিকারী চরম উত্তাপকে এল নিনোই বেশি উৎসাহিত করে। চলতি বছর সামুদ্রিক তাপদাহের পূর্বাভাস বলছে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত 'গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ' কিছুটা রেহাই পেতে পারে, যা প্রবালগুলোকে পুনরুদ্ধার হওয়ার সময় দেবে। তবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যেখানে তাপদাহের প্রভাবে সামুদ্রিক পাখি ও মাছের মৃত্যু, বিষাক্ত শৈবালের বিস্তৃতি এবং জেলিফিশের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।


বৃষ্টিপাত হ্রাস, খরা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা

বিশ্ব আবহাওয়ায় এই প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত হলেও আগামী কয়েক মাসেই বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করছে ডব্লিউএমও। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বৃহত্ এলাকা জুড়ে শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্যানামা খালে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার আশঙ্কায় এই কৃত্রিম জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ১০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি প্যানামার বার্ষিক প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।

ইন্দোনেশিয়া দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে তীব্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইতিমধ্যে ১০৭,০০০ হেক্টরেরও বেশি জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেদেশের সরকার কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য বিমানে ক্লাউড-সিডার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগে বহু মানুষকে গ্রেফতার করেছে। অন্যদিকে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশ বোতসোয়ানাতেও এল নিনোর প্রভাবে তীব্র খরার সৃষ্টি হয়েছে।


শক্তিশালী টাইফুন ও ভূমিধসের ঝুঁকি

হাজার মাইল দূরে চীনে এ বছরই সাতটি শক্তিশালী টাইফুন আঘাত হানার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যাকে গবেষকেরা সুপার এল নিনোর প্রভাব বলে মনে করছেন। ইতোমধ্যে জুলাই ও আগস্টে একাধিক টাইফুনের আঘাতে চীনে বহুলোকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল এবং দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াবে।

বিশেষ করে পেরুর উপকূলীয় অঞ্চল এই প্রভাবে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের চিকিৎসা সহায়তাকারী জাহাজ 'ইউএসএনএস কমফোর্ট' পেরু উপকূলে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু জরুরি ত্রাণই যথেষ্ট নয়; বরং ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন, দুর্বল পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো স্থায়ীভাবে সমাধান না করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক রূপ নেবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

একাত্তর/এআরএস
তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকা আবহাওয়া চক্র 'এল নিনো' এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বৈত প্রভাবে বিশ্বের মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ডে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু...
আটলান্টিক মহাসাগরে হ্যারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম সবেমাত্র শুরু হয়েছে, যা আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে এই ঝড়ের প্রকোপ সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করবে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এই...
নেপালের রসুয়া ও সংলগ্ন অঞ্চলে হিমবাহ ধস, বরফ ও কাদার প্রলয়ংকরী প্লাবনের ৯ দিন পর আপার ত্রিশূলি থ্রি-এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি টানেল বা সুড়ঙ্গ থেকে দুই কর্মীকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। গত...
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক ইউনিয়নের গোপীনাথপুরে এক বধির বৃদ্ধা নারীকে বাঁচাতে গিয়ে জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে। এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী সামান্য আহত হয়েছেন।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে আলো ছড়ানো খেলোয়াড়দের ঘিরে বিশ্বজুড়ে সদ্য সমাপ্ত মধ্য বছরের ট্রান্সফার উইন্ডোতে রেকর্ড বাণিজ্য হয়েছে। ফুটবল সংস্থা ফিফা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এই...
গভীর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শত শত কোটি ডলার সমমূল্যের স্বর্ণের রিজার্ভ যুক্তরাজ্যে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। বুধবার ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংক...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর