যুদ্ধের ১৯তম দিনে এসে ইরান তাদের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলি লারিজানি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী ‘বাসিজ’ বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। মার্কিন-ইসরাইলি এই যৌথ হামলাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিলেও তেহরান দাবি করেছে, তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, আমি জানি না কেন আমেরিকান ও ইসরাইলিরা এখনও একটি বিষয় বুঝতে পারছে না, ইরানের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এই কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে না। একের পর এক নেতাকে হত্যা করলেও, কাঠামো কখনও ভেঙ্গে পড়বে না।

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিনেই (২৮ ফেব্রুয়ারি) সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শহীদ হয়েছিলেন। তাঁর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে হারানোর পরও ইরান ভেঙে পড়েনি, বরং দ্রুত তাঁর উত্তরসূরি (মোজতবা খামেনি) নির্ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও যোগ করেন, যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও শহীদ হন, তবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য অন্য কেউ তৈরি আছে।
৬৭ বছর বয়সী আলি লারিজানি ছিলেন প্রয়াত খামেনি এবং বর্তমান নেতা মোজতবা খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী। তিনি এর আগে ইরানের পরমাণু আলোচক এবং পার্লামেন্ট স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানি গত ছয় বছর ধরে ইরানের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী- বাসিজের নেতৃত্বে ছিলেন। ইসরাইল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধ যুদ্ধে তাঁকে অন্যতম প্রধান কৌশলী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়ম বহির্ভূত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট করা ‘গ্যাংস্টারিজম’ বা সন্ত্রাসবাদের নামান্তর। তবে তিনি এও মনে করেন, যদিও একটি নেতার মৃত্যুতে ইরান ধ্বংস হবে না, তবে একের পর এক শীর্ষ স্তরের নেতাদের হারানো দীর্ঘমেয়াদে দেশটির গুণগত মানে প্রভাব ফেলতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, এ যুদ্ধ ইরান শুরু করেনি। তিনি বলেন, আমি আবারও বলছি, এই যুদ্ধ আমাদের পছন্দ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করেছে এবং এর ফলে ইরান, মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের যে মানবিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার জন্য ওয়াশিংটনকেই জবাবদিহি করতে হবে।

আলি লারিজানির মৃত্যু গত ১৯ দিনের যুদ্ধের মধ্যে তেহরানের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলেও, ইরান বিশ্বকে এই বার্তাই দিতে চাইছে, তাদের ‘সিস্টেম’ বা শাসনব্যবস্থা যে কোনো আঘাত সইবার ক্ষমতা রাখে। একদিকে শোকের ছায়া, অন্যদিকে যুদ্ধের ময়দানে অনড় অবস্থান- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
