দীর্ঘ নয় মাসের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে অবশেষে পর্যটকদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হলো দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। দীর্ঘ সময় পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা, হোটেল-রিসোর্ট মালিক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিলেন। তবে নতুন পর্যটন মৌসুম শুরুর এই ঘোষণায় তাঁদের মাঝে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ও স্বস্তি ফিরে এসেছে। দ্বীপের কটেজগুলো ধোয়ামোছা, রঙ করা এবং খাবারের প্রস্তুতি নিয়ে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা পার করছেন ব্যবসায়ীরা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর থেকে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট হয়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এর আগে নিরাপত্তার ও পরিবেশগত কারণে টেকনাফ রুট বন্ধ থাকায় কক্সবাজার থেকে যাতায়াত করায় পর্যটকদের সময় ও খরচ কিছুটা বেড়েছে।
১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটি ভ্রমণ করতে পারবেন। এবার দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা গত দুই বছর ধরে ছিল দুই হাজার। পাশাপাশি এবার শুরু থেকেই দ্বীপে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ভ্রমণ অনুমতিপত্র, কিউআর কোড এবং মাথাপিছু ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিয়ে পর্যটকদের যাতায়াত করতে হবে।

তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটলেও পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ। তাঁদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা দৈনিক দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা এবং শুরু থেকেই রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়ার ফলে দ্বীপের নাজুক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। সেন্টমার্টিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন এবং দ্বীপের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা (ক্যারিয়িং ক্যাপাস্টি) সেই অনুপাতে বাড়েনি।
উপগ্রহচিত্র ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অতীতে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে দ্বীপের প্রবালপ্রাচীরের প্রায় ২৫ শতাংশ অবক্ষয় ঘটেছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পর্যটন বন্ধ থাকায় সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন ও গুণগতমানে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গিয়েছিল।
দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার্থে প্রশাসন কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ করা, সৈকতে উচ্চস্বরে গানবাজনা না করা, রাতে আলো জ্বালিয়ে পরিবেশের ক্ষতি না করা এবং উন্মুক্ত স্থানে বারবিকিউর ওপর নিষেধাজ্ঞা।

এ ছাড়া ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াতও নিয়ন্ত্রিত রাখা হবে। তবে এসব নিয়ম বাস্তবে কতটা কঠোরভাবে কার্যকর করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেতৃবৃন্দ ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দ্বীপের স্থানীয় মানুষের জীবিকা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি পরিবেশের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন মডেল নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যটক বৃদ্ধি পেলেও দ্বীপের বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং এ নিয়ে বেসরকারি এনজিওগুলোও কাজ করছে। সার্বিক তদারকি ও সজাগ দৃষ্টির মধ্য দিয়ে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখেই পর্যটন পরিচালনা করা হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
