বিরোধিতার মুখে পাস হলো সাইবার নিরাপত্তা বিল

  •  বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তান করতে পারবে পুলিশ।
  •  মিথ্যা মামলা দায়ের করলে অপরাধ, হবে সাজা।
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:২৭ পিএম

সংসদে বিরোধিতার মুখেই পাস হলো বহুল আলোচিত ‘সাইবার নিরাপত্তা বিল-২০২৩’। পাস হওয়া বিলে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও মিথ্যা মামলা দায়ের করলে সেটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সাজার বিধান রাখা হয়েছে।

বুধবার সংসদের বৈঠকে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

বিলের ওপর আনা বিরোধী সদস্যদের জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি শেষে বিলটি কন্ঠভোটে পাস হয়।

বিলের বিভিন্ন ধারার সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় সদস্যরা বলেন, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের স্বীকৃতি সংবিধানেই দেওয়া হয়েছে। অথচ এই বিলের বিভিন্ন ধারায় সংবিধান স্বীকৃত এসব অধিকার খর্ব করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। একাধিক সদস্য বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও তল্লাশির বিধান সংশোধনের দাবি জানান।

এসব সমালোচনার জবাবে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত হলেও অবারিত নয়। স্বাধীনতা মানে কিন্তু অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা নয়। আপনার স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছে তা বলা নয়। অন্যকে অসম্মান করা নয়। নারীকে অশ্লীল কথা বলা নয়। এসব বিষয় নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইনটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিরোধী সদস্যরা একমত পোষণ করছেন। স্বচ্ছতা, জবাবহিদিতা ও নিরাপদ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সাইবার নিরপত্তা আইনের বিকল্প নেই।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনের উদ্যোগ নেয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে ওঠার পর পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।

আইনটির খসড়া প্রকাশের পর থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন বলে আসছে, সাইবার নিরাপত্তা আইনও কার্যত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মূল বিষয়বস্তু বহাল রাখা হচ্ছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো্ই এই আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করে তারা বলছেন, নতুন আইনে কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো ও জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হলেও অপরাধের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

পাস হওয়া বিলে মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে এই আইনের কোনো ধারায় মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার জন্য ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ না জেনেও মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেন বা করান, তাহলে তা হবে একটি অপরাধ।

এই অপরাধে মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তি এবং যিনি অভিযোগ দায়ের করিয়েছেন ওই ব্যক্তি মূল অপরাধটির জন্য যে দণ্ড নির্ধারিত রয়েছে সে দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি এই আইনের একাধিক ধারায় কোনো মামলা বা অভিযোগ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় বর্ণিত অপরাধগুলোর মধ্যে মূল অপরাধের জন্য যেটার দণ্ডের পরিমাণ বেশি হয় সেটাই দণ্ডের পরিমাণ হিসাবে নির্ধারণ করা যাবে।

বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধে অভিযোগ গ্রহণ ও মামলার বিচার করতে পারবে।

বিলের ৪২ ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে । এই ধারায় সাব ইন্সপেক্টর পর্যায়ের কর্মকর্তার পরিবর্তন এনে পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও ছিল।

বিলের ৮ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যম থেকে তথ্য–উপাত্ত অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ সাপেক্ষে, বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা দেশের কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য মহাপরিচালকের মধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।

বিলের ওপর আলোচনা

আলোচনায় অংশ নিয়ে গণফোরামের সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, বিতর্কিত জিডিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা এই আইনে যুক্ত করা হয়েছে। এটা অনেকটা নতুন বোতলে পুরনো মদ রাখার মতোই অবস্থা। আইনটি নতুন করে হচ্ছে কিন্তু স্বস্তি ফিরে আসছে না। যেভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছিল অনেকটা হুবহু সেভাবেই এই আইন করা হচ্ছে। জাতিসংঘ, সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের যেসব আপত্তি ছিল উদ্বেগের বিষয় ছিল সেগুলো রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ৯টি ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে সংশোধনের দাবি জানিয়েছিল সম্পাদক পরিষদ। এখন প্রস্তাবিত সাইবার আইনে ৭টি ধারায় সাজা ও জামিনের বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়নি। আগের মতই রয়ে গেছে। তার দুটি ধারায় কোন পরিবর্তনই আনা হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর থেকে দুটি ধারা বাতিলের আহ্বান করেছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে তা বাতিল না করে সাজা ও জামিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

মোকাব্বির বলেন, এই আইনটি ভিন্নমত সমালোচনা ও মুক্ত চিন্তা দমনের সবচেয়ে কার্যকর একটি হাতিয়ার। গত সাড়ে ৪ বছরে কেবল সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা ও মুক্ত চিন্তা দমনে প্রয়োগ করা হয়েছে। আর এই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সাংবাদিক কমিউনিটি। এই আইনের কারণে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা মারত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ অফিস ও দেহ তল্লাশির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সার্ভারসহ সব কিছু জব্দ করার সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। অন্য কোন আইনে পুলিশকে এত বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

এই আইনটি দিয়ে খুব সহজেই কাউকে হয়রানি করা যায় উল্লেখ করে মোকাব্বির খান বলেন, ‘রাষ্ট্রের যখন একজন শীর্ষ ব্যক্তি একটি জনপ্রিয় লিডিং পত্রিকাকে বলতে পারেন- এটি দেশের শত্রু, জাতির শত্রু। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। অভিযোগ থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে ওই পত্রিকার ডিকলারেশন বাতিল করা যেতে পারে। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার সরাসরি কতবড় হস্তক্ষেপ তা সহজেই অনুমান করা যায় না। যদিও হুমকির কারণ হিতে বিপরীত হয়েছে।'

জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, আইনটিতে কিছু রদবদল করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকেরা বলেছেন তারা সন্তুষ্ট নন। সংবিধানে বাক স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান হল মূল আইন। বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কোনো আইন তৈরি হলে তা হবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জাতীয় পার্টির সদস্য পীর ফজলুর রহমান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সবার কাছে বিতর্কিত ছিল। কিছুটা পরিবর্তন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে। এটিও স্বাধীন সাংবদিকতা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, ৪২ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনে সাংবাদিকদের বিষয়ে আলাদা সুরক্ষা রাখা প্রয়োজন ছিলো। প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ ছিল। মত প্রকাশ সাংবিধানিক অধিকার। এই আইনে মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২৭ শতাংশ মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। বেশিরভাগক্ষত্রে বাদী ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীরা।

জাতীয় পার্টির সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, কিছু কারিগরি বিষয়ে এই আইনের দরকার। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার হয়েছে খুব সামান্য। মূল মামলা হয়েছে চেতনা, অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে।

তিনি বলেন, সংবিধানে চিন্তা, সংবাদক্ষেত্র ও বাকস্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এগুলো থাকা অবস্থায় এইধ রনের আইন সংবিধানবিরোধী। এই আইনে অপরাধের সংজ্ঞা একই রাখা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো হয়েছে। এই আইনে গণমাধ্যমের সেলফ সেন্সরশিপ বাড়বে।

জাতীয় পার্টির সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহমদ বলেন, ৪২ ধারা নিয়ে আপত্তির কথা তুলে ধরে এটিসহ সব বেআইনি ধারা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

জাতীয় পার্টির সদস্য মুজিবুল হক বলেন, সাংবাদিকেরা কলম ধরেন দেশের স্বার্থে। তাদের বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলকে যুক্ত করার সুযোগ ছিলো। ৪২ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা আছে। এসময় তিনি সম্প্রতি ছাত্রলীগের দুজন নেতাকে থানায় নিয়ে নির্যাতনের ঘটনার কথা তিনি তুলে ধরেন।

কেএসএইচ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন আহবান করা হয়েছে। আগামী ৯ নভেম্বর (সোমাবার) বিকেল সাড়ে তিনটায় ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ আজ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিলের লক্ষ্যে আনা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ আজ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। সরকারি ছুটির দিন এবং আগামী ৩১ আগস্ট ও এক সেপ্টেম্বর ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল তিনটা এ অধিবেশন বসবে।
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি অব্যাহত রয়েছে। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এ রোগে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে...
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ গণমাধ্যম। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমের সব থেকে বেশি ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিডিয়া যদি...
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা শেষে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতেই পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য...
নিজ নির্বাচনী এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও মহড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দেশব্যাপী তোলপাড় ও সমালোচনার মুখে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর