সাজা পাওয়া আসামি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে তিনি রীতিমতো একজন পেশাদার প্রতারক। কিন্তু বেশভূষা দেখে বোঝার উপায় নেই। ফেসবুক আইডিতে বিভিন্ন স্টাইলের ছবি, টিকটকে আকর্ষণীয় ভিডিও কনটেন্ট। আর এসবের মাধ্যমে নারীদের আকৃষ্ট করে সম্পর্ক গড়তেন। তারপর সুযোগ বুঝে বাসাবাড়ি, অফিস থেকে চুরি করে নিতেন দামি মালামাল।
বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার খেলোয়াড় স্বর্ণা আক্তারের বাসায় চুরির ঘটনায় জড়িত আল-আমিন দেওয়ান ওরফে আযানকে বুধবার রাতে দিনাজপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
আযানের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে স্বর্ণার চুরি হওয়া মোবাইল ফোন, ডলারসহ অন্য মালামাল। আর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বেরিয়ে এসেছে নানা অজানা তথ্য।
র্যাব বলছে, আল-আমিন ওরফে আযান মূলত প্রতারণার টার্গেট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন আইডি খুলে নিজেকে বড় ব্যবসায়ী পরিচয় দিতেন। নারীদের আকৃষ্ট করতে নিয়মিত পোস্ট করতেন বিভিন্ন স্টাইলের ছবি। এছাড়াও নিজেকে প্রদর্শনের জন্য টিকটকে ভিডিও আপলোড করা হতো।
এভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের সঙ্গে কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তোলার পর তাদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আস্থা অর্জন করে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ চলতো বলে জানিয়েছে র্যাব।
সম্পর্ক গড়ে ওঠার পরই চুরি কাণ্ড শুরু হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন আযান। প্রয়োজনে কোনো নারীকে বিয়েও করতেন তিনি। অপেক্ষা করতেন সুবিধাজনক সময়ের জন্য। সুযোগ এলে নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে কৌশলে আত্মগোপন করতেন আল-আমিন ওরফে আযান। প্রয়োজনে এক এলাকা ছেড়ে আরেক এলাকা চলে যেতেন। বিচ্ছিন্ন করে দিতেন সব ধরনের যোগাযোগ। সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডি ডিলেট এবং মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেওয়া হতো।
কিছুদিন যাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন করে আবার অন্য কারো সঙ্গে ফের প্রতারণার লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকটি আইডি খুলে এই আযান সক্রিয় হতেন বলে র্যাব জানিয়েছে।

যেভাবে পরিচয় স্বর্ণার সঙ্গে
র্যাব বলছে, প্রতারণা করে মালামাল চুরির উদ্দেশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে পরিচিত হন আযান। তিনি নিজেকে গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, বর্তমানে ছুটি কাটাচ্ছেন এবং কাপড়ের ব্যবসা করছেন। এরপর ওই নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন। পরিচয়ের ১৭ দিনের মাথায় গত ১২ জানুয়ারি আল-আমিন ওরফে আযান ঐ নারী ক্রিকেটারকে বিয়ে করেন।
এদিকে জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার স্বর্ণা আক্তারের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন ভুক্তভোগী ওই নারী ক্রিকেটারসহ চারজন। প্রায় তিন বছর ধরে তারা রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার একটি ফ্ল্যাটে বাস করছেন।
র্যাব বলছে, বিয়ের পরে ওই একই ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা একটা রুমে থাকতে শুরু করেন আল-আমিন। এ সময় প্রতারণার উদ্দেশ্যে অন্যদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন আল-আমিন।
যেভাবে চুরি
গত সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তিন রুমমেট ও সতীর্থদের নিয়ে রাজধানীর তেজকুনীপাড়া খেলাঘর মাঠে অনুশীলনে বের হন স্বর্ণা। এসময় আল-আমিন বাসাতেই ছিলেন।
র্যাব বলছে, স্বর্ণা বের হতেই তার রুমের ওয়ারড্রবের ড্রয়ারের তালা ভেঙ্গে ফেলেন আযান। সেখানে থেকে ডলার, একটি চেক বই, ভিসা কার্ড এবং স্বর্ণার রুমমেট অন্য নারী ক্রিকেটারের ব্যাগ থেকে ছয় হাজার ৫০০ টাকা ও তাদের ব্যাগ নিয়ে বাসা ত্যাগ করেন। তবে প্রথমে তিনি যান তেজকুনীপাড়া খেলাঘর মাঠে। স্বর্ণাদের অনুশীলনের ভিডিও করার কথা বলে তার দুটি মোবাইল ফোন ব্যাগ থেকে নিয়ে কিছুক্ষণ ছবি তুলে কৌশলে মাঠ থেকে পালিয়ে যান আযান।
এরপর প্রথমেই চলে যান রাজধানীর এক পুরাতন মালামাল বিক্রির মার্কেটে। সেখানে স্বর্ণার একটি আইফোন ১১ হাজার টাকায় বেচে দেন। প্রতিবেশী দেশে আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন আযান। প্রথমে রংপুর গিয়ে হোটেলে রাত কাটিয়ে পরেরদিন দিনাজপুর আরেকটি হোটেলে ওঠেন।

এদিকে অনুশীলন শেষে আল-আমিনকে না পেয়ে অন্য নারী ক্রিকেটারের ফোন থেকে স্বর্ণা আক্তার নিজের দুটি ফোনে কল করে বন্ধ পান। এরপর বাসায় ফিরে দেখেন ফ্লাটের মূল দরজা লক করা। দারোয়ানের সহযোগিতায় তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে রুমের সমস্ত জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পায়। চুরির বিষয়টি বুঝতে পারেন।
স্বর্ণার বাসা থেকে চুরি যাওয়া মালামালের মধ্যে রয়েছে- দুটি আইফোন, সাড়ে তিন হাজার মার্কিন ডলার, ব্যাংকের চেক বই ও ভিসা কার্ডসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। এ ঘটনায় আল আমিন ওরফে আযানকে আসামি করে ক্রিকেটার স্বর্ণা আক্তার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি চুরির মামলা করেন।
যেভাবে ধরা
স্বর্ণার চুরির ঘটনা সামনে আসার পরই অভিযানে নামে র্যাব। বুধবার রাতে র্যাবের একটি দল দিনাজপুর থেকে মো. আল-আমিন দেওয়ান ওরফে আযানকে (২৯) গ্রেপ্তার করে। তার পিতা মৃত আবুল কালাম। ঢাকার চকবাজারের বাসিন্দা। পার্শ্ববর্তী একটি দেশে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দিনাজপুরে আত্মগোপন করে বলে জানায় র্যাব।
আযানের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চারটি আইফোন, পাঁচটি মোবাইল ফোন, প্রাইম ব্যাংকের চেক বইয়ের একটি পাতা, প্রাইম ব্যাংকের একটি মাস্টার কার্ড, বেশ কিছু বৈদেশিক মুদ্রা, তিনটি হাত ঘড়ি, চারটি চেইন, একটি নোজপিন, একটি ব্রেসলেট, দুইটি আংটি ও একটি হ্যান্ড ব্যাগ।
র্যাব বলছে, গ্রেপ্তার আল-আমিন ২০১১ সালে রাজধানীর একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে বলে জানিয়েছেন। এক সময় রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে কাপড়ের দোকানে চাকুরি করতেন। পরে ২০১৭ সাল থেকে নারীদের সঙ্গে প্রতারণাসহ অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা শুরু করে। আর প্রতারণার পর পার্শ্ববর্তী একটি দেশে আত্মগোপনে চলে যেতেন আযান।
আযান জানিয়েছে, সে ২০২২ সালে প্রথম বিয়ে করেন। এর আগে বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে প্রতারণার কথা জানতে পারায় প্রথম স্ত্রী তাকে ত্যাগ করেন। আল-আমিনের বিরুদ্ধে রাজধানী ও চাঁদপুরের বিভিন্ন থানায় চারটির বেশি মামলা রয়েছে এবং এসব মামলায় সে তিনবার বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেছে।
গ্রেপ্তার আল-আমিন ওরফে আযানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে র্যাব জানিয়েছে।
ক্রিকেটার স্বর্ণার ফোনসহ মালামাল উদ্ধার, আসামি গ্রেপ্তার