গুটিকয়েক ব্যক্তি দেশের ব্যাংকগুলোকে ‘ফাঁকা করে শেষ করে দিয়েছে’। অথচ তাদেরকেই নতুন করে টাকার যোগান দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এভাবে চললে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদসহ বিশ্লেষকরা।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকিংখাতে সংস্কারসহ আর্থিক খাতের রোগ সারানোর কোনো উদ্যোগ নেই বলেও জানান তারা।
শনিবার দেশের সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠন এডিটরস গিল্ডের ‘প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫ অর্থনৈতিক রাজনীতির হিসাব’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলে তারা।
এবারই প্রথম, বাজেটের আকারের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে কী করণীয় রেখেছেন অর্থমন্ত্রী তা বিষয়ে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, আমরা সবাই একমত হবো যে, এটা এখনও কিন্তু যথেষ্ট অস্থিতিশীল অবস্থায় আমরা আছি। বিশেষ করে যদি মূল্যস্ফীতির কথা বলি, এখনও নিয়ন্ত্রণে নেই।

অর্থনীতিবিদ ও পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকিং খাতে যারা টাকা সরিয়ে নিয়ে গেছে, খালি করে ফেলেছে, তা উদ্ধার করার জন্য বাংলাদেশে ব্যাংক যথেষ্ট লিকুইডিটি ইনজেকশন করেছে। এবং এই ইনজেকশনটা কিন্তু আবার টাকা ছাপানোর মতোই।
সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, এখন বাজেট কমাবো না মূল্যস্ফীতি কমাবো, একেবারে যদি আমরা প্রবৃদ্ধিকে স্তব্ধ করে দেই এটার ফোন কিন্তু আরও খারাপ হবে।
হু হু করে বেড়া চলা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ব্যাংকিং খাত। সুশাসনের অভাবই ব্যাংকিংখাতের বড় সংকট বলেও জানান বক্তারা।
এফবিসিসিআই সভাপতি ও সাবেক এমপি এ কে আজাদ বলেন, ব্যাংকগুলো পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়া দিয়েছে কয়েকজন লোক। যাদের নাম আমরা সবাই জানি। প্রত্যেকটা ব্যাংক আজকে খালি।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, মালয়েশিয়া নিয়ে যে কেলেঙ্কারি দেখলাম আমরা, পাঁচটা লোক ২১ হাজার কোটি টাকা কামিয়ে গেলো। এর জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি।
এনবিআরের স্বক্ষমতা না বাড়িয়ে রাজস্বের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর সমালোচনাও করেন বক্তারা। তাগিদ দেন অপচয় বন্ধ করার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের কনসিসটেন্সি এবং কন্টিনিউটি পলিসি থাকতে হবে। তা না হলে মানুষ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কারণ আমি যদি এখন একটা হিসাব করি, এরমধ্যে আপনি যদি ট্যারিফ পাল্টে দেন বা একটা ফ্যাসিলিটি তুলে দেন, তখন তো আমার পুরী হিসাব বদলে যাবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, পৃথিবীজুড়ে কিন্তু ক্যাপিটাল মার্কেটে ক্যাপিটাল গেইনস কোথাও নাই। এখন আমারও তো অলরেডি মৃত মার্কেট। এনার্জি এবং লংটার্ম ফাইনান্স ছাড়া আমি পরের ধাপে যেতে পারবো না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, যে অরাজকতা চলছে তা আমাদের থামাতেই হবে। কারণ আমরা ইশতেহারেই বলছি জিরো টলারেন্স টু দুর্নীতি। তাহলে আমরা কার্যত কী করছি?
সংকট সমাধানে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর পরামর্শ আলোচকদের।
এডিটরস গিল্ডের সভাপতি ও একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু বলেন, সুশাসনের যাত্রা শুরু হয়েছে। বড় বড় কাউকেই ছাড়া হচ্ছে না। এবং এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে, বিশেষভাবে আরেকটু যদি ব্যাংক লন্ডারারদের দিকে হাত দেয়া হয়, টাকাগুলো ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং ক্যাপিটাল ফ্লাইট বন্ধ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে কার বাড়িঘর আছে এগুলো যদি একাউন্টেবল করা হয়, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা, বাংলাদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং কৃষক বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ঈদকে ঘিরে লেনদেনে অর্থনীতিতে স্বস্তি