দেশে আরো বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা, আলোচিত যত

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:০৫ পিএম

গত কয়েকদিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এসব ঘটনায় হতাহত হয়েছেন শত শত মানুষ।

এখন মানুষের মধ্যে ভূমিকম্পের আতঙ্ক বেশ ভালোভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক সময়ই দেখা যায় ‘ভূমিকম্পের’ কথা শুনলেই সড়কে বেরিয়ে জড়ো হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ছোটাছুটি করছে দিগ্বিদিক।

এ অবস্থায় ভারতীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ এবং বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান পর্যালোচনা করে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, যে কোনো মুহূর্তে দেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। এ ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে রাজধানীসহ পুরো ঢাকা বিভাগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ।

২১ নভেম্বর, ২০২৫ ভূমিকম্পে ঢাকার আরমানিটোলার একটি ভবনের রেলিং ধসে পড়ে। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

এ অবস্থায় আলোচনায় আসছে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য যতো ভূমিকম্প ও এর ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী বছর বছর ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছেই

  • ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও তার কাছাকাছি এলাকায় ২৮টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
  • ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টি।
  • ২০২৪ সালে তা আরো বেড়ে হয় ৫৪টি।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৮১৮ ও ১৮২২ সালের ঘটনা। ১৮২২ সালে সিলেটে ৭.৫ মাত্রার এবং শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যত ভূমিকম্প

সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা অঞ্চলে ১৫৪৮, ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৭৬২, ১৭৬৫, ১৮১২, ১৮৬৫ ও ১৮৬৯ সালে ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সে সময়ের যন্ত্রের অভাবে এসব ভূমিকম্পের সঠিক মাত্রা জানা যায়নি।

গত ১২০-১২৫ বছরে বাংলাদেশে মাঝারি ও বড় মাত্রার প্রায় একশ’র মতো ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এর মধ্যে ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু ভূমিকম্প

চলতি বছরের যতো ভূমিকম্প

২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুভূত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিলো ভারতের আসাম রাজ্যের মরিগাঁও। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিলো ৫ দশমিক ৩। 

এছাড়া চলতি বছরের ৫ মার্চ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যার উৎপত্তিস্থল ছিলো ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ৪৪৯ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিলো রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৬।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিলো ভারতের আসাম রাজ্যে।

এরপর ২১ সেপ্টেম্বর ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ১৮৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। বেলা সাড়ে ১২টার পর অনুভূত হওয়া এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিলো সিলেটের ছাতকে।

গত ২১ নভেম্বর দেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওইদিন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের দিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। এর কেন্দ্রস্থল ছিলো নরসিংদীর মাধবদী।

শুক্রবারের মাঝারি মানের ওই ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত সারাদেশে ১০ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে।

২২ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটেও দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মৃদু ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলও ছিলো নরসিংদীর পলাশে। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিলো ৩ দশমিক ৩।

২৭ নভেম্বর বিকেল চারটা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে সবশেষ কম্পনটি অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিলো ৩ দশমিক ৬। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিলো মাত্র ১০ কিলোমিটার। আর কেন্দ্র থেকে টঙ্গির দূরত্ব ছিলো ২১ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরপূর্বে।

একইদিন প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ভোর ৩টা ২৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে বঙ্গোপসাগর ও ৩টা ৩০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে সিলেটে ভূকম্পন অনুভূত হয়।

মে-আগস্ট ২০২৩

২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাত ৮টা ৪৯ মিনিটে রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ইউএসজিএস’র তথ্য অনুযায়ী এর মাত্রা ছিলো রিখটার স্কেলে ৫.৫, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প।

একই বছরের ১৬ জুন রাজধানীসহ সারাদেশে ৪.৫ মাত্রার মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিলো সিলেটের গোলাপগঞ্জ।

২০২৩ সালের মে মাসের পাঁচ তারিখে আরেকটি ভূমিকম্প হয় ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস এর হিসেব অনুযায়ী, ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিলো ৪.৩। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিলো ঢাকার কাছে বিক্রমপুরের দোহার থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এটিরও গভীরতা ছিলো মাত্র ১০ কিলোমিটার।

ভূমিকম্পের আগে-পরে শিলংয়ে সরকারি ভবনের অবস্থা। ইমেজ- জিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া

২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর সকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিস জানায় রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিলো ৫.৬। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে এই ভূমিকম্পটি ঘটে।

২৫ এপ্রিল ২০১৫

নেপালে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। এই ভূমিকম্প এতটাই প্রবল ছিলো যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, চীনসহ আশপাশের প্রায় সব দেশেই এর কম্পন অনুভূত হয়।

৪ জানুয়ারি ২০১৬

২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি ৬.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। ওই সময় আতঙ্কে প্রাণ হারান ছয়জন।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের মনসাই ব্রিজ। ইমেজ -জিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া

১৯৯৯ সালের ভূমিকম্প

বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের শেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পটি হয় মহেশখালী দ্বীপে। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে এই দ্বীপকেন্দ্রিক ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পে দ্বীপের অনেক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯৯৭ সালের ভূমিকম্প

১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে ভূমিকম্পের কারণে চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন ধসে পড়ে।

১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল দেখা দেয়।

১৯১৮ সালের ভূমিকম্প

১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এই কম্পন মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অনুভূত হয়। শ্রীমঙ্গলে ওই ভূমিকম্পে অনেক দালান-কোঠা ধ্বংস হয়ে যায়।

১৯৫০ সালের ভূমিকম্প

১৯৫০ সালে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ৮.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। এতে ভারতে চার হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কম্পন অনুভূত হয় বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের কিছু অংশে, তবে এসব এলাকায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

১৯০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যত ভূমিকম্প

এছাড়া ১৯৩৪ সালে বিহারে সংঘটিত ভূমিকম্পের ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছিল।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প

১৮৯৭ সালের ১২ জুন শিলং প্ল্যাটোতে ৮.২ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক নামে পরিচিত। এর ঝাঁকুনি দিল্লি থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত অনুভূত হয়। মেঘালয়, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলে এই ভূমিকম্পে ১৬০০-র বেশি মানুষ প্রাণ হারান।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই ভূমিকম্পের পর ইংরেজরা আতঙ্কে তাঁবু টাঙিয়ে থাকতে শুরু করেন এবং অনেকে কয়েক মাস নৌকায় বসবাস করেছিলেন।

১৮৮৯ সালের ভূমিকম্প

১৮৮৯ সালের ১০ জানুয়ারি মেঘালয়ে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর কেন্দ্রস্থল ছিলো ভারতের মেঘালয়ের জৈন্তা পাহাড়। এই ভূমিকম্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুব কম পাওয়া যায়, তবে সিলেট শহরসহ আশপাশের এলাকায় এর কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছিল।

১৮৮৫ সালের ভূমিকম্প

১৮৮৫ সালে মধুপুর ফল্টে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, যা বেঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এর উৎপত্তিস্থল ছিলো মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া। ধারণা করা হয় এর মাত্রা ছিলো ৬.৫ থেকে ৭.০। এটি এতোটাই প্রবল ছিলো যে ভারতের সিকিম, বিহার, মনিপুর এবং মিয়ানমার পর্যন্ত এর কম্পন অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি, মিঙ্গুন প্যাগোডা । ছবি:  দ্য ব্রিটিশ লাইব্রেরি

ঢাকা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও পাবনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। উল্লেখ্য, একই বছরের জুনে আরেকটি ভূমিকম্প হয়েছিল, যা কলকাতা ও দার্জিলিংয়েও অনুভূত হয়েছিল।

১৭৮৭ সালের ভূমিকম্প

শিলং প্ল্যাটোতে গত ৪০০ বছরে অসংখ্য ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্প। এই ভূমিকম্প ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। আগে এই নদী ময়মনসিংহের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো, কিন্তু এখন এটি যমুনা নদীর কাছ দিয়ে বয়ে চলেছে।

১৭৬২ সালের ভূমিকম্প

টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফল্ট লাইনে ৮.৫ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। এর ফলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উঁচুতে উঠে আসে, যা আগে ছিলো ডুবে থাকা দ্বীপ। মিয়ানমারের একটি দ্বীপ এই কম্পনে ছয় মিটার উপরে উঠে যায়। একই ভূমিকম্পে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে কঠিন শিলা ভেদ করে নিচ থেকে কাদা ও বালুর উদগীরণ ঘটে।

এই ভূমিকম্পের কারণে বঙ্গোপসাগরে সুনামি হয় এবং সুনামির ঢেউয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাড়িঘর ভেসে গিয়ে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

১৫৪৮ সালের ভূমিকম্প

১৫৪৮ সালে আসামে এ অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর একটি হয়। ওই ভূমিকম্প এই অঞ্চলের ভূ-গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল, যদিও কী ধরনের পরিবর্তন তা বিস্তারিত জানা যায় না। এর প্রায় ১০০ বছর পর আসামে আবার একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।

বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা

ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা—এই তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ। বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, যে কোনো সময়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় এ ধরনের ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পৃথিবীর ১৬টি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের মানচিত্র

তারা বলছেন, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়া ইন্ডিয়ান-বার্মা টেকটোনিক প্লেটে গত শতাধিক বছরেও কোনো বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। ফলে এই প্লেটে দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই শক্তি যে কোনো মুহূর্তে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের রূপে মুক্তি পেতে পারে।
 এমন মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা তার ধাক্কা সামলাতে পারবে না। কয়েক হাজার ভবন ধসে পড়বে এবং লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার একাত্তরকে বলেছিলেন, ঢাকায় যদি মাত্র সাত মাত্রার ভূমিকম্পও হয়, আমাদের বর্তমান প্রস্তুতি, ভবনের গঠন ও জনঘনত্বের কারণে ভয়াবহ বিপর্যয় হবে। এত বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতে অনমাত্র অনেক সময় লাগবে।

শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুযায়ী বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত—উত্তরে তিব্বত প্লেট, পূর্বে বার্মা সাব-প্লেট এবং পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট। এই জোনের বিস্তৃতি সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার। এখানে বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে এবং প্রতি শতবর্ষে বড় মাত্রার ভূমিকম্প ফিরে আসার নিয়ম রয়েছে।

ভূতত্ববিদদরা বলছেন, বাংলাদেশের সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েকটি প্লেট থাকার কারণে এসব এলাকা ভূমিকম্পের বড় ধরণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঢাকায় গত কয়েক বছরের মধ্যে যেসব ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশের উৎপত্তিস্থলই ছিলো বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে সিলেট বা চট্টগ্রাম অঞ্চলে। অনেকগুলো ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিলো ভারতের মিজোরাম বা ত্রিপুরা রাজ্যে।

তবে ঢাকার আশেপাশে উৎপত্তিস্থল রয়েছে, এমন ভূমিকম্পও মাঝেমধ্যেই হতে দেখা গেছে।

ঢাকার কাছে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলেও গত ২০ বছরের মধ্যে একাধিক ছোট ছোট ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় পৃথিবীর সব স্থলভাগ একসঙ্গে যুক্ত ছিলো। পরবর্তীতে পৃথিবীর উপরিতলের প্লেটগুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়। এই প্লেটগুলোকেই বিজ্ঞানীরা টেকটোনিক প্লেট বলেন। এগুলো একে অপরের পাশাপাশি লেগে থাকে। কোনো কারণে প্লেটগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হলে শক্তি সঞ্চিত হয়। এই শক্তি সিসমিক তরঙ্গ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

তরঙ্গ যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, তবে তা ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছে এবং অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে ভূত্বককে কাঁপিয়ে দেয়। এই কাঁপুনিই ভূমিকম্প।

এই প্লেটগুলোতে ভূগর্ভে নানা চ্যুতি বা ফল্ট রয়েছে, যেগুলো ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং হিমালয়ের পাদদেশের এলাকাগুলো অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের ওপর।

এ অবস্থায় ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের মাত্রা ও চক্র বিবেচনায় ভূমিকম্প

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চলে ৮ বা ততোধিক মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত ২৫০ থেকে ৩০০ বছরের চক্রে ফিরে আসে। অন্যদিকে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে পুনরাবৃত্তি ঘটে।

বাংলাদেশের সূচক মানচিত্র। যেখানে ভূতাত্ত্বিক প্রদেশ, টেকটোনিক প্লেট এবং দুটি ক্রস সেকশনের অবস্থান দেখানো হয়েছে।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) অনুযায়ী, বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে সারা দেশে ৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে:

  • ১১ লাখ ৯ হাজার পাকা ভবন
  • ২১ লাখ ১৪ হাজার সেমি-পাকা স্থাপনা
  • ৪০২টি খাদ্যগুদাম
  • ১৪টি গ্যাস ফিল্ড
  • ১৯৫টি হাসপাতাল
  • ১ হাজার ৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক/কল্যাণকেন্দ্র
  • ২ হাজার ৮০০টি উচ্চ বিদ্যালয়
  • ১ হাজার ৯০০টি মাদ্রাসা
  • ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • ৬ হাজার ৮০০টি পুলিশ স্টেশন
  • ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক
  • ৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার স্থানীয় সড়ক
  • ২০ হাজার সেতু
  • ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার রেললাইন

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের অঞ্চলের ব্লক মডেল, যা ভারতীয় প্লেটের পূর্বমুখী অবনমন এবং ডাউকি চ্যুতির অবস্থান চিত্রিত করে। সূত্র: বার্গি, পি., জে. হাবার্ড, এস.এইচ. আখতার, ডি.ই. পিটারসন (২০১৯)।

জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের খবরেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের যে ঝুঁকি রয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে গত কয়েক বছরে বারবার ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়া থেকে। এগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ।

ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড যেহেতু একশ’ থেকে দেড়শ’ বছর, বাংলাদেশ এখন সেই সময়ের খুব কাছাকাছি এসে গেছে। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহেও ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে ঢাকার ঝুঁকি সবচেয়ে ভয়াবহ, কারণ এখানকার অধিকাংশ ভবনের গঠনগত মান অত্যন্ত দুর্বল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে যদি রাজধানীর এক শতাংশ বিল্ডিং ধ্বংসে পড়ে তাহলে তিন লাখ মানুষ হতাহত হবেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থেকে আরও অনেকের মৃত্যু হবে।

একাত্তর/আরএ/এসি
ভারতের নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন সফলভাবে শেষ হয়েছে। গত ৮-১১ জুন অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী...
ভারতের নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন সফলভাবে শেষ হয়েছে। গেলো ৮ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত...
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রায় ৯ বছর পার হতে চললেও রোহিঙ্গা সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান তো মেলেইনি, উল্টো দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মহলে একাধিক নতুন...
দীর্ঘ গোপনীয়তা আর বিশ্বজুড়ে তীব্র জল্পনা-কালের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর অফিশিয়াল ও চূড়ান্ত লিখিত রূপ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার...
পূর্ব সুন্দরবন থেকে অপহৃত হওয়ার তিন দিন পর মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন পাঁচ জেলে। বুধবার (১৭ জুন) সকালে বনদস্যুদের কবল থেকে তারা ছাড়া পান। তবে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসা জেলেদের মধ্যে একজন দস্যুদের মারধরে...
লক্ষ্মীপুরের একটি আবাসিক ছাত্রাবাসে আইফোন চুরির অপবাদ দিয়ে ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ, হত্যার পর ঘটনাটি...
স্বল্প পুঁজি নিয়ে বোলাররা লড়াই করার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হলো না। প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশকে চার উইকেটে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেলো অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার লেগ...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর