লক্ষ্মীপুরের একটি আবাসিক ছাত্রাবাসে আইফোন চুরির অপবাদ দিয়ে ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ, হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে এবং বর্তমানে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সাত দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির আবাসিক ছাত্রাবাসে এই ঘটনা ঘটে।
নিহত স্কুলছাত্রের নাম নিহত মেহেদী হাসান (১৪)। সে ওই একাডেমির অষ্টম শ্রেণির ছাত্র এবং উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়নের রাঘবপুর গ্রামের জিয়াউদ্দিন জিয়ার ছেলে।
প্রতিষ্ঠান সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত ১৪ জুন কলেজ শাখার এক শিক্ষার্থীর একটি আইফোন হারিয়ে যায়। ওই ফোন চুরির অভিযোগে আবাসিক ছাত্র মেহেদী হাসানের ওপর সন্দেহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী মেহেদীকে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। চুরির কথা স্বীকার করানোর জন্য সেখানে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করা হয়।
একাডেমির আবাসিক শিক্ষক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ফোন হারানোর ঘটনায় মেহেদীর ওপর সন্দেহ করা হয়েছিলো। পরে কয়েকজন ছাত্র তাকে একটি কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারধর করে। আমরা খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়াল করতে মেহেদীর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো।
মেহেদীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার রাত আটটার পর থেকে শত শত ক্ষুব্ধ মানুষ ও স্বজনরা ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটক, অভ্যর্থনা কক্ষসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং কয়েকটি যানবাহনে আগুন দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানের কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করছে একাডেমি কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। গভীর রাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মেহেদীর মরদেহ নিয়ে রামগঞ্জ থানার সামনে আবারও বিক্ষোভ করেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিহতের চাচা জুয়েল রানা বলেন, আমার ভাতিজা কোনো অপরাধ করেনি। তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এই নির্মম হত্যার বিচার চাই এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী জানান, মোবাইল চুরির অভিযোগে শিক্ষার্থীকে মারধর করার বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তবে শুধুমাত্র মারধরের কারণেই মৃত্যু হয়েছে নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ৯ শিক্ষার্থী ছাত্রাবাস ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সবাইকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। প্রকৃত সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। আইন অনুযায়ী দায়িদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির অধ্যক্ষ খন্দকার আবদুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
