ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিকল্পিত হত্যাকান্ডসহ ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৩২ নাগরিক। বিবৃতিতে তারা দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও তুলেছেন।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
এতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, খুশী কবির, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নাসহ ৩২ জনের নাম রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রাপ্ত সংবাদ থেকে আমরা গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিগত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকান্ডসহ ধারাবাহিক সংখ্যালঘু নাগরিককে হত্যা, তাদের পরিবারের বাড়ী-ঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যা নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিপ্রায়ে করা হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা বিরাজ করছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস, যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী, নরসিংদীর শরৎ চক্রবর্তী মণিসহ বেশ কয়েকজন এই সব হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের রাউজানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ীতে ঘরের দরজা বন্ধ করে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আমরা এ সকল ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও তীব্রতম ভাষায় নিন্দা ও ধিক্কার জানাই।
এতে বলা হয়, আমরা জানি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তথা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কোন বিশেষ ধর্ম, সম্প্রদায় বা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা ঘৃণা বিরাজ করে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। পক্ষান্তরে এই সব সহিংস সাম্প্রদায়িক হামলা বা হত্যাকান্ড যারা ঘটাচ্ছে তারা সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ যারা সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী এবং রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত নাশকতা সৃষ্টিকারী। নিঃসন্দেহে তারা আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে বিঘ্নিত করতে তৎপর। দেশী-বিদেশী উস্কানীদাতা পৃষ্ঠপোষকগোষ্ঠীও এদের মদদ দিয়ে চলেছে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
আরও বলা হয়, এ সকল ঘটনা থেকে এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি গোষ্ঠী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এগুলো ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আমরা সর্বত্রই সহনশীলতা, সমমর্মিতার মনোভাব লক্ষ করে থাকি। যুগ যুগ ধরে এদেশের সকল ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির সাথে এদেশে বসবাস করে আসছে। আমরা বিস্ময় ও ক্ষোভের সাথে এও লক্ষ করছি, ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং নাশকতা, হত্যা-হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের কাঠগড়ায় সোপর্দ করতে সরকার বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা এই সকল ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানাচ্ছি। সেই সাথে এ সকল ঘটনার পেছনে কারা জড়িত রয়েছে তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে জনগণকে অবহিত করা এবং তাদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
এ সকল ঘটনার প্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট দাবি হচ্ছে-
১. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা, বাড়ী-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেইসাথে এর উস্কানী/ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।
২. সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকানপাটসহ সকল স্থাপনা, মন্দির, গীর্জাসহ সকল উপাসনালয়ের সুরক্ষা দিতে অন্তবর্তী সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলকাগুলিতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
৩. হিন্দুসহ দেশের সকল ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুর ধর্মীয় ও সামগ্রিক জীবনের নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অবিলম্বে প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দিতে হবে। নিয়মিত কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
৪. মূলধারার সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে এ সকল ঘটনা সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ করতে দেশবাসীকে এবং বিশেষ করে স্ব স্ব দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিশেষ উদ্যোগ নেবার আহবান জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন-
১. আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ, সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংরক্ষন পরিষদ
৩. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৪. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৫. রাশেদা কে. চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
৬. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
৭. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
৮. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
৯. মো: নুর খান, মানবাধিকার কর্মী
১০. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১১. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১২. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৩. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৪. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এবং পলিটিকাল সাইন্স
১৫. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৬. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৭. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৮. ড. ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
১৯. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
২০. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২১. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন
২২. পারভেজ হাসেম, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
২৩. রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট
২৪. শাহ ই মবিন জিননাহ, নির্বাহী পরিচালক, সিডিএ
২৫. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
২৬. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২৭. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
২৮. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী
২৯. জবা তালুকদার, সমাজকর্মী
৩০. ঈশিতা দস্তগীর, গবেষক
৩১. মেইনথিন প্রমীলা, আদিবাসী অধিকার কর্মী
৩২. হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
‘বরাদ্দের শতভাগ লুট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রতিবাদ
‘বিমানের দুই কর্মকর্তার কাণ্ড’ শিরোনামে সংবাদের প্রতিবাদ