দেশটাকে যারা চায়নি, তারা কীভাবে এই দেশকে ভালোবাসবে?—যশোরের নাভারণের যুদ্ধকালীন থানা কমান্ডার আলমগীর কবীরের এই একটি প্রশ্ন যেন একাত্তরের পুরো চেতনার সামনে এক বিশাল আয়না ধরে। সত্তরোর্ধ্ব এই মানুষটির চোখে এখনো ভাসে একাত্তরের সেই দিনগুলো, যা তাকে দিয়েছে বীরত্বের গৌরব, আবার একই সঙ্গে দিয়েছে পিতাকে হারানোর আমৃত্যু শোকগাঁথা।
যশোরের নাভারণের গঞ্জম আলী সরকারের বাড়ির সন্তান আলমগীর কবীর। একাত্তরে তিনি ছিলেন তোলারাম কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। কিন্তু বই-খাতা ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। যার বাবা ডা. আজিজুর রহমান সব সময় বলতেন, ‘মার্শাল ল দিয়ে পাকিস্তান টিকবে না,’ সেই বাবার আদর্শেই বড়ো হওয়া আলমগীর কবীরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি কলেজ জীবনেই।

প্রতিরোধের সেই উত্তাল দিনগুলো
বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের পর থেকেই নাভারণে শুরু হয় প্রস্তুতির পালা। সিরাজুল হক মঞ্জুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পুলিশ ও ইপিআর সদস্যদের সঙ্গে মিলে সাধারণ মানুষও রাস্তায় নামে। আলমগীর কবীর স্মৃতি হাতড়ে বলেন, আমরা যশোর ক্যান্টনমেন্টের রাস্তায় পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতাম, যেন পাকিস্তানি সেনারা বের হতে না পারে। মনে হচ্ছিলো দেশটা বুঝি স্বাধীন হয়েই গেছে।
কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর ম্যাসাকারের মুখে তারা পিছু হটে ভারতের বনগাঁয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেখান থেকে বিহারের চাকুলিয়ায় আড়াই মাসের কঠোর সিএনসি স্পেশাল ট্রেনিং। ট্রেনিং শেষে আট নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার কে. এন. হুদা তাকে কমান্ডার করে পাঠান লক্ষণপুর গ্রামে। তার অধীনে ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের সাতটি দল।
রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া সেই রোমাঞ্চকর অপারেশন
গেরিলা যুদ্ধের স্মৃতি বলতে গিয়ে আলমগীর কবীর শোনান বেনাপোলের সেই দুঃসাহসী অভিযানের কথা। পাকিস্তানি সেনারা মাইন বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে অতিরিক্ত বগি লাগিয়ে রাখত। রাত আড়াইটার দিকে দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা অপারেশন চালান। একদল এক্সপ্লোসিভ লাগায়, অন্যদল কভার দেয়। বিকট শব্দে উড়িয়ে দেওয়া হয় রেললাইন। সেই খবর পরদিন দিল্লির আকাশবাণী থেকেও প্রচার করা হয়েছিলো।

একাত্তরের সেই ক্ষত: বাবাকে হারানো
বিজয় যখন দুয়ারে, আলমগীর কবীর তখনো জানতেন না তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। ডিসেম্বরের শুরুতে অ্যামুনিশন আনতে গেলে কমান্ডার কে. এন. হুদা তাকে বলেছিলেন, ‘আর অস্ত্র লাগবে না, পতাকা বানিয়ে রেডি থাকো। দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে।’
কিন্তু বিজয়ের আনন্দে মিশে ছিল বিষাদের কালো মেঘ। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তার ৭২ বছর বয়সী বাবা ডা. আজিজুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায়। বাড়ির পথ চিনিয়ে দিয়েছিলো রাজাকার আব্দুল কাদের শুকুর। এরপর আর ফেরেননি বাবা, মেলেনি তার মৃতদেহও। আলমগীর কবীর বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেন, ‘এই পবিত্র মাটিতে আরও লাখো শহীদের রক্তের মতোই মিশে আছে আমার বাবার রক্ত।’

আক্ষেপ ও অভিমান
দেশ স্বাধীন হলেও আলমগীর কবীরের মনে জমে আছে এক পাহাড় অভিমান। তার আক্ষেপ—শহীদ ওমরসহ তার সহযোদ্ধারা যথাযথ মর্যাদা পাননি। চারদিকে অমুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ নেওয়ার হিড়িক দেখে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও নেননি কোনোদিন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের চেয়ে বিলীন করার চেষ্টাই যেন বেশি হয়েছে কালে কালে।
‘শহীদ পিতার হত্যাকারীরা মৃত্যুর আগপর্যন্ত ঘৃণাই পাবে। যারা স্বাধীন দেশ চায়নি, এ দেশের প্রতি তাদের কোনো টান থাকতে পারে না।’
বাবার হত্যাকারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর লাল-সবুজের পতাকার প্রতি অদম্য ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে আছেন এই যোদ্ধা। আলমগীর কবীরদের মতো মানুষদের আক্ষেপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা নয়, এটি অসংখ্য ডা. আজিজুর রহমানের রক্ত আর আলমগীর কবীরদের ত্যাগের এক পবিত্র আমানত।
